আইনস্টাইন ও নিউটনের আবিস্কার প্রত্যাখ্যান ভারতীয় বিজ্ঞানীদের: আবু মহি মুসা

0
60

আট জানুয়ারী,২০১৯ তারিখ একটি দৈনিক পত্রিকায় ‘আইনস্টাইন ও নিউট এর আবিস্কার প্রত্যাখ্যান ভারতীয় বিজ্ঞানীদের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় কয়েকজন বিজ্ঞানীদের দাবি, আইনস্টাইন ও নিউটন বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব দিয়েছেন। একট্ িঅনুষ্ঠানে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, হিন্দু ধর্মীয় মহাকাব্য রামায়ণে বর্ণিত রাজ্য রাবণের ২৪ রকম বিমান ছিল। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জি. নাগেশ্বর রাও দাবি করেন, ভারতে কয়েক হাজার বছর আগেই স্টেম সেলের গবেষণা ছিল। তামিল নাড়–র আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী দাবি করেন, আইজাক নিউটন ও আলবার্ট আইনস্টাইন উভয়েই ছিলেন ভুল। নিউটন অভিকর্ষ শক্তি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। আইনস্টাইনের তত্ত্ব বিভ্রান্তিকর। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রাচীন ভারতের যেসব লেখনি পাওয়া গেছে তা এখনও পড়া হয় এবং তা থেকে অনন্দ পাওয়া যায়।
গত বছর ভারতের শিক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সত্যপাল সিং ইঞ্জিনিয়ারিং পুস্কার বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিমানের কথা প্রথম উল্লেখ করা হয়েছে হিন্দুদের প্রাচীন মহাকাব্য রামায়নে। তিনি আরো দাবি করেন, রাইটব্রাদার্স আবিস্কারের আট বছর আগেই প্রথম কার্যকর বিমান আবিস্কার করেছিলেন একজন ভারতীয় নাগরিক। তার নাম শিবাকর বাবুজি তালপাড়ে।
২০১৪ সালে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসক ও মেডিকেল ষ্টাফদের এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিন্দুদের দেবতা গণেশের কাহিনী তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, গণেশের মাথা হলো হাতির। আর তা যুক্ত হয়ে আছে মানবীয় শরীরের সঙ্গে। এতে প্রামণিত হয় যে, প্রাচীন ভারতে কসমেটিক সার্জরির প্রচলন ছিল।
এখানে যে কজন বিজ্ঞানী নিউটন এবং আইনস্টাইনের তত্ত্বকে অস্বীকার করে বলেছেন যে নিউটন এবং আইনস্টাইন উভয়েই ছিল ভুল। তারা কি জানেন বিজ্ঞান কাকে বলে? আমাদের সভ্যতার দর্শন শুরু হয়েছে খ্রীস্টপূর্ব ৬ শতকে । আজ দুহাজার সাল। অর্থাৎ ছাব্বিশ শত বছরেও আমরা জানতে পারিনি বিজ্ঞান কাকে বলে। শুধু তাই নয়, ভাবগত কোন বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি? দর্শনের সংজ্ঞা পেয়েছি? বিজ্ঞানের সংজ্ঞাই যদি না পাওয়া যায়, তাহলে তারা নিজেদের বিজ্ঞানী হিসেবে দাবি করে আইনস্টাইন এবং নিউটনের সূত্র ভুল বললেন কিভাবে? বিজ্ঞানের যে সংজ্ঞাটি পড়ানো হয়, তা হচ্ছে, ‘ কোনো বিষয়ের সুসংঘবদ্ধ জ্ঞানই হচ্ছে বিজ্ঞান।’ এটাকে সংজ্ঞা বলা যাবে? বিজ্ঞানের যে সংজ্ঞাটি পাওয়া গেছে এটা সম্পূর্ণ ভুল। তারা এতদিন বিজ্ঞানের ভুল ব্যাখ্যা পড়ে কি খুব আনন্দ পেয়েছেন?
বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দেয়ার আগে জানতে হবে কি কি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দুটো বিষয় নিয়ে বিজ্ঞান। একটি জ্ঞান, অন্যটি বস্তু। জ্ঞান ছাড়া যেমন বিজ্ঞান হবে না, তেমনি বস্তু ছাড়াও বিজ্ঞান হবে না। যদিও অতীন্দ্রিয় বিজ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। রাইটব্রাদার্স বিমান আবিস্কার করেছেন। এটা বিজ্ঞানীদের ব্যাপার। বিমান আবিস্কারের জ্ঞান তারা কোথায় পেয়েছেন? বিশ্বপ্রকৃতিতে। আকাশে পাখি উড়তে দেখে। এটাকে বলা হয় সাংকেতিক ভাষা। তারা কোনো কালেই যদি আকাশে পাখি উড়তে না দেখতেন, তাহলে তাদের পক্ষে বিমান আবিস্কার করা সম্ভব ছিল না। বিমান আবিস্কারের নক্সা পেয়েছেন পাখির কাছ থেকে। এখন বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দেয় সহজ। যেমন, ‘যে জ্ঞান সরাসরি বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত অথবা যে জ্ঞান বস্তুর মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করে সেটাই হচ্ছে বিজ্ঞান।’ এখানে যেমন জ্ঞান আছে, তেমনি বস্তুও আছে। বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী আইনস্টাইন এবং নিউটনকে বিজ্ঞানী বলা যাবে কিনা এটা প্রশ্ন নয় । প্রশ্ন হচ্ছে তারা যে মতবাদ দিয়েছেন সেটা কতটা ভুল।
দর্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, মতবাদকে বিচারা করার ক্ষেত্রে হচ্ছে চারটি। যেমন, বস্তুবাদী জ্ঞান, ভাববাদী জ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান এবং দার্শনিক সাধারণ জ্ঞান। এই চারটি দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়কে বিচার করা যাবে। কিন্তু মতবাদ দেয়ার ক্ষেত্র হচ্ছে তিনটি। বস্তুবাদী ক্ষেত্র, ভাববাদী ক্ষেত্র এবং ংুহঃযবঃরপ ঃবৎৎধরহ বা মিশ্র ক্ষেত্র। বস্তুবাদী এবং ভাববাদীদের মধ্যে কেনো বিরোধ নেই। কিন্তু মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা দেবেন প্রমাণ, দার্শনিকরা দেবেন যুক্তি। প্রমাণ এবং যুক্তি এক হতে হবে। মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ৯০ ভাগ প্রমাণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন ডারউইন বিবর্তনবাদে অনেক প্রমাণের কথা উল্লেখ করে বলেছেন মানুষের পূর্বপুরুষ ছিল প্রাইমেট। । কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, মিশ্রক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা যতগুলো বিষয়ে মতবাদ দিয়েছেন, মনুষ সৃষ্টি, বিগ ব্যাং, ব্লাক হোল, বিশ্বের সম্প্রসারণ, পৃথিবী ধ্বংস, সময়, সবগুলো মতবাদ যুক্তিহীন ভিত্তিহীন।
মধ্যাকর্ষণের আবিস্কারের বিষয়টি কোন ক্ষেত্রের এটা ভারতের ওই বিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন? মধ্যাকর্ষণের সূত্র এবং আপেক্ষিক তত্ত্ব, এগুলো হচ্ছে মিশ্রক্ষেত্রের । মধ্যাকর্ষণের সূত্র আবিস্কারের সাংকেতিক ভাষা ছিল আপেল পড়া। আপেলটা নিচে না পড়ে উপরের দিকে গেল না কেন? ম্যাগনেটিক আকর্ষণের ফলেই আপেলটা নিচের দিকে পড়েছে। যেটাকে বলা হয়েছে ‘মধ্যাকর্ষণ’। এই মধ্যাকর্ষণ না থাকলে আপেলটা কখনোই নিচে পড়ত না। এটা কি ভুল? ভারতের ওই বিজ্ঞানীরা কিভাবে বললেন, নিউটন এবং আইনস্টাইনের মতবাদ ভুল?
ওই বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, হিন্দু ধর্মীয় মহাকাব্য রামায়ণে বর্ণিত রাজ্য রাবণের ২৪ রকম বিমান ছিল। বিষয়টি এরকম কাজির গরু খাতায় আছে বাস্তবে নেই। ২৪ রকম বিমান ঠিক অনুরূপ।
অন্য দিকে ভারতের শিক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সত্যপাল সিং দাবি করেন, রাইটব্রাদার্সের আবিস্কারের আট বছর
আগেই প্রথম কার্যকর বিমান আবিস্কার করেছিলেন একজন ভারতীয় নাগরিক। তার নাম শিবাকর বাবুজি তালপেড়ে। শিবাকর বাবুজি তালপেড়ে রাইটব্রাদর্সের আগে যদি বিমান আবিস্কার করে থাকেন, এ দাবি এত দিন পরে কেন? সে বিমানগুলো কোথায় রাখা হয়েছিল? কোন কোন দেশের সাথে বিমান যোগাযোগ ছিল?
বরং তারা যদি বলতেন, স্টিফেন হকিংয়ের ‘বিগ ব্যাং থিরী’ বোগাস তাহলে এটা মেনে নেয়া যেত। এটা ছিল ভুল। তেমনি স্টিফেন হকিংকে বিজ্ঞানী বা দার্শনিক কোনোটাই বলা যাবে না। এর চারটি যুক্তি আছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, তার কোন জ্ঞান বস্তুর সাথে সরসরি সম্পৃক্ত ছিল না?
কবি নজরুল তার একটি কবিতায় বলেছেন, ‘বিশ্বজগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুড়ে।’ অমনি
কবি ভক্ত অনেকে দাবি করে বসলেন, মোবাইল ফোন সৃষ্টির ধারণা প্রথম নজরুল দিয়েছেন। রবীন্দ্র ঠাকুর সোনার তরী কবিতায় বলেছেন, ‘রাশি রাশি ভারা ভারা. ধান কাটা হলো সারা।’ তিনি হয়তো কোনো কৃষককে ধান কাটতে দেখে এ কবিতাটি লিখেছেন। বিষয়টিকে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অনেকে এটাকে আধ্যাত্মিকতার মধ্যে টেনে নিয়ে আসছেন। রামায়ণে বর্ণিত রাজ্য রাবণের ২৪ রকম বিমান ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে ছিল কি?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গণেশের মাথা হলো হাতির। আর তা যুক্ত হয়ে আছে মানবীয় শরীরের সঙ্গে।
এতে প্রামণিত হয় যে, প্রাচীন ভারতে কসমেটিক সার্জরির প্রচলন ছিল। মূল রহস্য এখানে, দুর্গার ছেলে গনেশ। গনেশের জন্ম হওয়ার পর গনেশের মামাকে দুর্গা বলেছিলেন ছেলেটাকে দেখার জন্য। গনেশের মামা শনিদেব বলেছিলেন যে, আমি ওকে দেখলে ওর অমঙ্গল হবে। তবুও বার বার বলার পরে শনিদেব দেখতে আসেন। দেখার পরই গনেশের ধর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গনেশও ছিলেন দেবতা। গনেশ তখনও জীবি। এভাবে জীবিত থাকা যায় না। কাছেই ছিল একটা হাতি। হাতির মাথাটা কেটে গনেশের মাথায় লাগিয়ে দিয়েছিল। আর এ কারণেই গনেশকে এ ভাবে পাওয়া গেছে। এবং গনেশেরও পুজা করা হয়।
বাস্তবে কেউ পেরেছেন, হাতির মাথা কেটে এনে মানুষের মাথায় লাগাতে? সে সময় কি বিজ্ঞান এত উন্নত
ছিল? মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরানের সূরা নূরের ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘এই গ্রন্থের কিছু আয়াত আছে সুস্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন, অন্য গুলো রূপক। অর্থাৎ কাল্পনিক। পরের আয়াতে বলা হয়েছে, যারা ফ্যাতনা সৃষ্টিকারী, নাস্তিক তারা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করেন। হিন্দু ধর্মে ‘গনেশ’ নামক যে প্রাণীর কথা বলা হয়েছে এটা ছিল তেমনি রূপক। এ দিয়ে কি দাবি করা যায় প্রাচীন ভারতে কসমেটিক সার্জরির প্রচলন ছিল? সে সময় কি তারা এতই জ্ঞানী ছিলেন? হিন্দু ধর্মে সতিদাহ প্রথা, এ প্রথাটা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগরের সময়ে রহিত করা হয়েছে। কসমেটিক সার্জারির প্রচলন যদি প্রাচীন কালে হয়ে থাকে, এবং জ্ঞান বিজ্ঞানে তারা যদি এতটা অগ্রগামী হয়ে থাকেন, তাহলে সতিদাহ প্রথার মতো এরকম একটি জঘন্য বিষয় রহিত হতে এতদিন সময় লাগলো কেন? তারা কয়েক হাজার বছর আগে কসমেটি সার্জারির চিন্তা করতে পেরেছেন? এই জঘন্য বিষয়টিকে সাথে সাথে রহিত করতে পারলেন না কেন? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো ভুল। সে ভুলগুলো কি তারা আজ পর্যন্ত শুধরাতে পেরেছেন? যুগে যুগে ঐ সকল তথাকথিত বিজ্ঞানীরা মাঝে মাঝে বোগাস কথা বলে পৃথিবীর সব মানুষকে বোকা বানিয়ে রেখেছেন। যেমন, বোকা বানিয়ে রেখেন বিগ ব্যাং থিওরীর প্রবক্তা স্টিফেন হকিং। কাজেই নিউটন এবং আইনস্টাইন যে বক্তব্য দিয়েছেন, দূরদর্শিতার জন্য তাদেরকে স্যালুট জানাতে হয়।

তামিলনাড়–র এক বৈজ্ঞানিক বলেছেন, বলেছেন, নিউটন এবং আইনস্টাইনের তত্ত্ব একেবারে ভুল। এখন থেকে মাধ্যকর্ষণ তত্ত্বের নাম দেয়া হবে ‘নরেন্দ্র মোদি ওয়েব এবং ‘গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং এফেক্ট এর নাম হবে ‘হর্ষবর্ধন এফেক্ট’। হর্ষবর্ধন বতমানে ভারতের প্রযুক্তি মন্ত্রী। জানা গেছে তার সুপারিশে এসব মহাত্ম ভারতীয় বিজ্ঞান কংেগ্রেসে বলার সুযোগ পেয়েছে।
অন্য দিকে ইন্ডিয়ান সাইন্টিফিক কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক প্রেমেন্দু পি.শাথুর বলেন, ‘আমরা তাদের বক্তব্যে সহমত নই। আমরা তাদের দাবি থেকে নিজেদের দূরে রাখছি। ’ ভারতের ওই তথাকথিত বিজ্ঞানীরা শূন্য মাঠে গোল দিয়ে বাহবা কুড়িয়ে নিয়েছেন, তাদের ওই বক্তব্যে শাথুর একমত নন, তার প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এ জন্য তাদরকেও সাধুবাদ জানাতে হয়।
লেখক ঃ দার্শনিক।

LEAVE A REPLY