এত বন্দুকযুদ্ধের পরও বেড়েছে মাদক কেনাবেচা

0
16

তারা নিউজ ডেস্ক:

ঢাকঢোল পিটিয়ে সাঁড়াশি অভিযান আর কথিত বন্দুকযুদ্ধের পর অনেকে ধরে নিয়েছিল, দেশে মাদকের পাচার ও কেনাবেচা কমে যাবে। কিন্তু ফলাফল উল্টো। অভিযান শুরুর এক বছরের মাথায় এসে দেখা যাচ্ছে, মাদকের আমদানি ও কেনাবেচা কমেনি, বরং বেড়ে গেছে।

পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে, অভিযান শুরুর পর গত এক বছরে বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে ৫ কোটি ১৪ লাখ ইয়াবা বড়ি এবং ১০ মণ হেরোইন উদ্ধার হয়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এর আগে কোনো বছরেই ৪ কোটির বেশি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, স্থলপথ ও জলপথ দুই দিক থেকেই মাদক আসছে। এক বছরে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার তারই বড় প্রমাণ।

এ ধরনের অভিযানের পরও বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, এটা অভিযানেরই সুফল। এটিকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখন মানুষ সচেতন হয়েছে, তারা খবর দিচ্ছে। সে কারণে এসব উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে।

মাদকের ভয়াবহতা রোধে গত বছরের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে অভিযান শুরু হয় ১৫ মে থেকে। এই অভিযানে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৩৫৮ জন মাদক ব্যবসায়ী। তাঁদের মধ্যে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১৬৯ জন, র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১০৬ এবং বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১২ জন নিহত হন। বাকি ৭১ মাদক ব্যবসায়ী নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মাদক এখন আর অত সহজলভ্য নেই। তা ছাড়া যাঁরা এই ব্যবসায় যুক্ত, তাঁরাও প্রকাশ্যে নেই। এখন মাদক কেনাবেচা হলেও তা খুব গোপনে ও সীমিত পর্যায়ে হচ্ছে। তিনি বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে চলমান অভিযানের কারণে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, সরকার যে পন্থায় মাদক নির্মূল করতে চাইছে সেটা কোনো কাজে আসছে না। এক বছরের পরিসংখ্যান তার বড় প্রমাণ। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে, প্রতিষ্ঠানগুলোও ভেঙে পড়বে। আর এতে কোনো সুফলও আসবে না।

মাদকবিরোধী অভিযানের এক বছর
৫ কোটি ১৪ লাখ ইয়াবা উদ্ধার
অভিযানে নিহত ৩৫৮ জন
১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর আত্মসমর্পণ

সরকারিভাবে ধরে নেওয়া হয়, দেশে ৬০-৭০ লাখ লোক মাদকাসক্ত। এরা মাদকের পেছনে বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, যা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বার্ষিক বাজেটের তিন গুণ। আর পুলিশের বাজেটের ৪ ভাগের ৩ ভাগ। দেশব্যাপী এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তিন হাজারের মতো ব্যবসায়ী, যাঁদের সাড়ে তিন শর মতো গডফাদার রয়েছে। এসব ব্যবসায়ী ও গডফাদার সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর তালিকাভুক্ত। প্রতিবছর এসব তালিকা হালনাগাদ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অভিযানের পাশাপাশি ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাবে রাজি হয় সরকার। এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে অস্ত্র ও মাদক জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁরা এখন কারাগারে। নতুন করে আবারও কিছু ইয়াবা ব্যবসায়ীর আত্মসমর্পণ করানো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, অভিযান শুরুর পর থেকে টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ৭৩টি বাড়ি ও ২৭টি নৌযান গুপ্ত হামলায় ভাঙচুর হয়েছে। সর্বশেষ ২ মে টেকনাফের ইসলামাবাদ গ্রামের ইয়াবা ব্যবসায়ী সলিম উল্লাহর বাড়িতে গুপ্ত হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে অভিযানের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইয়াবার নিয়ন্ত্রক সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ এবং তাঁদের স্বজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ইয়াবার তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও সাবেক সাংসদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নিকট আত্মীয়রা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

মাদকবিষয়ক গবেষক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক এম ইমদাদুল হক বলেন, দুটো কারণে মাদক কমছে না। এক. বাজারে এর প্রচুর চাহিদা। দুই. অধিক মুনাফার কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের লোকেরা সরাসরি মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। এটা বন্ধ করতে হলে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। শুধু লোক দেখানো অভিযান করে কোনো লাভ হবে না।

LEAVE A REPLY