ওয়াসার চেয়ারম্যান ১১ বছরে কী করেছেন?

0
6

তারা নিউজ ডেস্ক:

ঘন্টাখানেকের বৃষ্টিতেই জনপদ হাঁটুপানি থেকে কোমরপানিতে ডুবে থাকা ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাংবৎসরিক চিত্র। কেননা নগরের নালাগুলো পরিষ্কার ও সংস্কারের চর্চা নেই। নালা ও নর্দমা থেকে ময়লা উঠিয়ে ফেলে রাখা হয়, যা আবার নর্দমাতেই গিয়ে পড়ে। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন হয়, বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং মশার বিস্তারসহ জীবাণু সংক্রমণ বাড়ছে। ক্ষতি হচ্ছে অর্থনীতির। পানি ও পয়োনিষ্কাশনের একক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ওয়াসা। এদের জন্য সরকারি বরাদ্দ বছর বছর বাড়ছেই, কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে মহানগর মুক্তি পাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মধ্যে চলে চক্রাকার কাদা–ছোড়াছুড়ি এবং চিঠি–চালাচালি। কিন্তু নগরবাসীর কষ্টের কোনো সমাধান হয় না।

ওয়াসা প্রধানের ব্যর্থতা
ওয়াসার ব্যর্থতা এর প্রধানের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখতে হবে। বর্তমান প্রধান টানা পাঁচ মেয়াদে ১১ বছর ধরে দায়িত্বে আছেন। ‘ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা’ কর্মসূচিতে কাজ শুরুর ১০ বছর পর দেখা যাচ্ছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহকৃত পানি এতই আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় যে সেটা পানীয় হিসেবে তো দূরের কথা, স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করাও মুশকিল। প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবার মান তো বাড়েনি, বরং গ্রাহক পর্যায়ে পানির মান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ জমেছে, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বেড়েছে, সময়ে নগরে জলাবদ্ধতা বেড়েছে, পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন না হওয়ায় নদীদূষণ বেড়েছে এবং পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পানির মূল্য। গত বছরই ওয়াসার পানি কতটা ‘সুপেয়’, তা দেখানো এবং সেই পানি দিয়ে ‘শরবত’ তৈরি করে এমডিকে পান করানোর জন্য কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

ওয়াসার হিসাব বলছে, ঢাকার ৮০ শতাংশ এলাকায় এখনো পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের ডুবে যাওয়া নিয়মিত ঘটনা। ওয়াসা এমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে যে খোদ সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সামনেই সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়। পানির মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গত ১২ বছরে অন্তত ১৩ বার পানির দাম বেড়েছে। ২০০৯ সালে যে পানির দাম ছিল পৌনে ৬ টাকা, এখন তা ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা। ২০১৯ সালে ঢাকা ওয়াসা ২৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করেছে, যেখানে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বাড়ানোর এখতিয়ার রয়েছে।

মিথ্যাচার আদালতে
ঢাকা নগরীতে ৩৮টির বেশি খাল ছিল, খালগুলো দখলমুক্ত এবং ভরাটমুক্ত রাখতে ওয়াসা ও পাউবো দশকের পর দশক ব্যর্থতা দেখিয়েছে। গত ৮ ডিসেম্বর হাইকোর্ট যেসব সুয়ারেজ লাইন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য পড়ছে, সেগুলো ছয় মাসের মধ্যে বন্ধে ওয়াসার যে অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়ন করতে বলেছেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে হলফনামা আকারে আদালতে প্রতিবেদন দিতেও বলা হয়। পরে দেখা গেছে, ওয়াসা এমডির পক্ষে বুড়িগঙ্গায় সুয়ারেজ সংযোগ না থাকা বিষয়ে দৃশ্যত অসত্য তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০ জানুয়ারি হাইকোর্ট বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকায় নদীতীরে থাকা পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন ২৩১টি শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। এটা দৃশ্যমান যে ওয়াসা তার ড্রেনেজ সার্কেল দিয়ে নগরীর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের খালগুলোকে বক্স কালভার্ট নালায় পরিণত করেছে এবং নগরীর পয়ো ও শিল্পবর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ না করেই সেখানে ঢেলে দিচ্ছে। বৃষ্টির পানির নালায় পয়োবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য ফেলা নিশ্চিতভাবেই কোনো ভালো ব্যবস্থাপনা নয় এবং পরিবেশের জন্য অনুপযোগী।

নিয়োগের বৈধতা চুক্তিভিত্তিক
ওয়াসায় পদ শূন্য রেখে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অপসংস্কৃতি চালু করেছেন ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান। তাঁর টানা পাঁচ মেয়াদে নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ ও অব্যাহত পুনর্নিয়োগ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি ওয়াসার সব পর্যায়ের কর্মকর্তা–কর্মচারীর বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, প্রতিবারই তাঁর নিয়োগ নবায়নের ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে।’

সব মিলিয়ে অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত এমডিকে বরখাস্ত করা দরকার। পানি বাণিজ্যিকীকরণ থামিয়ে নিরাপদ পানি সরবরাহে ওয়াসার সঠিক মনোযোগ আনা দরকার। দরকার গ্রাহক অভিযোগ সমাধানের চর্চা। পয়োনিষ্কাশনের নামে নদীতে বর্জ্য উন্মুক্তকরণ বন্ধ করা দরকার। দরকার নর্দমা ও নালা সংস্কারের টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন। সবার জন্য নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন নিশ্চিত করতে টেকসই পরিকল্পনার পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন জরুরি।

জ্বালানি অপচয়, পানি বাণিজ্যিকীকরণ ও নিম্নমান পানি
১৭ এপ্রিল ২০১৯ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় জানা যায়, ‘ঢাকা ওয়াসার পানির নিম্নমানের কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানের উপযোগী করেন। ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে বা সেদ্ধ করে পান করেন। গৃহস্থালি পর্যায়ে পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে প্রতিবছর আনুমানিক ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হয়।’ এমতাবস্থায় দেশে বাজারজাত পানি ও শোধনের ফিল্টার ব্যবসা প্রসারিত হয়েছে। ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানির অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে ‘সমস্যা’ সমাধান করার চেষ্টা না করে ওয়াসা এমডি সরবরাহকৃত পানি ‘সুপেয়’ দাবি করেছেন। সরবরাহ নিরাপদ করার বিপরীতে, নিরাপদ পানি সরবরাহ থেকে মনোযোগ সরিয়ে খোদ ওয়াসাই ‘ড্রিংক ওয়েল’ নামে শোধিত পানির ব্যবসায় নেমেছে। অত্যন্ত আপত্তিজনক যে ‘ড্রিংক ওয়েল’ ফিল্টারের জন্য ‘এটিএম’ আদলে প্রিপেইড ডিসপেন্সার করেছে, তার জন্য অপ্রয়োজনীয় ও খরুচে পেমেন্ট কার্ড চালু করেছে। যদিও ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে প্রচলিত ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং সংযোগ দিয়ে পেমেন্ট অবকাঠামো করাই যুক্তিযুক্ত ছিল। একদিকে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হলো, অন্যদিকে শোধিত পানির নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। এতে নগরে জীবনযাপনের খরচ বাড়ছে।

LEAVE A REPLY