জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্নয়নের ত্রাস

0
8

তারা নিউজ ডেস্ক:

‘জলবায়ু পরিবর্তন’ এখন সন্ত্রাসীর মতোই বড় ভয়ের নাম। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৎপরতা তাই অনেক বাড়ছে। জাতিসংঘ নিজেই এ নিয়ে সক্রিয়। কিয়েটো প্রটোকলের পর প্যারিস চুক্তি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণসহ নানা উদ্যোগ এরই বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে স্কুলশিশুদের নেতৃত্বে ধর্মঘটসহ নানা তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে সব দেশেরই মানুষ। এসব তৎপরতা, প্রতিবাদের মর্মকথা হলো, বিদ্যমান উন্নয়ন ধরন (উৎপাদন, আহরণ, প্রবৃদ্ধি, জীবনযাপন, ভোগ) দিয়ে বিশ্ব এক মহাবিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর থেকে রক্ষা পেতে গেলে উন্নয়নধারার মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। সেই পরিবর্তন নিয়েই দরবার, দর–কষাকষি এবং বোঝাপড়া, ক্ষেত্রবিশেষে চুক্তি। কিন্তু সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অপরিবর্তনের দুষ্টচক্রের মধ্যেই আটকে যাচ্ছে সব উদ্যোগ।

১৯৯৭ সালে কিয়োটো প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যারা আসল অপরাধী সেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত—সর্বোপরি বিশ্ব করপোরেট গোষ্ঠী যথারীতি গা না লাগানোয় কোনো কাজ হয়নি। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে আরেকটি সমঝোতা হয়, ফলাফল একই রকম। এর মধ্যে বিশ্বের জলবায়ু–পরিবেশের আরও অবনতি হয়েছে; পাশাপাশি যুদ্ধ, সহিংসতা, দখল–গণহত্যায় বিশ্বের মানবিক পরিবেশ আরও অবনতির শিকার হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, সঙ্গে বেড়েছে বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তাও। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছে প্যারিস চুক্তি। বিশ্বের বর্তমান ‘উন্নয়ন’ ধারার প্রধান কারিগর যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পের নেতৃত্বে সেই চুক্তি ত্যাগ করেছে।

এসব আন্তর্জাতিক নানা সম্মেলনের প্রধান সমস্যা দুটো। প্রথমত, যে উন্নয়ন–দর্শন বিশ্বকে এই রকম বিপদগ্রস্ত অবস্থায় নিয়ে গেছে, তার প্রধান অংশীদারদের কর্তৃত্ব বজায় রেখে, তাদের স্বার্থ সমুন্নত রাখার সব ব্যবস্থা অটুট রেখেই ঘোষণা, লক্ষ্য ও কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে ভালো ভালো লক্ষ্য খণ্ড খণ্ড পরিকল্পনার অধীনে তাদের মর্জি দ্বারাই পরিচালিত হয়। এবং পরস্পরবিরোধী স্বার্থরক্ষায় দেখা দেয় গোঁজামিল। দ্বিতীয়ত, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অব্যাহত সন্ত্রাসী তৎপরতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও তার উৎস স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি, সমরাস্ত্র উৎপাদন, দখল, গণহত্যা নিয়ে কোনো ঘোষণা, প্রতিশ্রুতি, কর্মপরিকল্পনা এসব সম্মেলনে দেখা যায় না।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সব আন্তর্জাতিক দরবারেই বাংলাদেশ সরকারকে অনেক উৎসাহী ও সক্রিয় দেখা যায়। সরকার একদিকে প্রাণ–প্রকৃতিবিনাশী উন্নয়নধারা নিয়ে জোরকদমে চলে আর অন্যদিকে এসডিজি বাস্তবায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক তহবিল পেতে প্রাণান্ত চেষ্টা করতে থাকে। বর্তমান উন্নয়নধারায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, তবে যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যে ‘উন্নয়ন’ ধারা বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করছে, তার পরিবর্তন না করে ‘ক্ষতিপূরণ’ বা ‘সাহায্য’ এখন অন্যতম অ্যাজেন্ডা, আসল কারণ দূর না করে জলবায়ু বিষয়ে বিশাল তহবিলের আয়োজন। তার দিকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার ও দেশি–বিদেশি বহু নতুন–পুরোনো এনজিও কনসালট্যান্টদের নজর। সাহায্য বা ক্ষতিপূরণের নামে তহবিলের ভাগ পাওয়ার বিষয়ে সরকারের যত আগ্রহ, নিজেদের ভূমিকা পরিবর্তনে ততটাই অনাগ্রহ। কী সেই ভূমিকা?

বাংলাদেশে নদী, বন খুন হচ্ছে ভুল প্রকল্প বা দখলদারত্বের জন্য। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বিশ্ব ঐতিহ্য কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বাঁধ সুন্দরবনসহ উপকূলের সর্বনাশ ঘটতে যাচ্ছে রামপাল, পায়রা, মাতারবাড়ী, বাঁশখালী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ ভূমি ও বনগ্রাসী বিভিন্ন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের জন্য। অপরিমেয় দায়িত্বহীনতায় বিশাল ঋণ আর বিপদের বোঝা তৈরি করে পারমাণবিক বিদ্যুতের ঢোল পেটানো হচ্ছে। দেশে পাহাড় চলে যাচ্ছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে। বাতাস, পানি, খাদ্য বিষাক্ত হচ্ছে মুনাফার উন্মাদনায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতে ফারাক্কাসহ বিভিন্ন বাঁধ ও নদীসংযোগ পরিকল্পনায় নদীপ্রবাহে বড় আঘাত। এ ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা অতিশয় দুর্বল।

এসব ঘটনা দেখলে যে কেউ স্বীকার করবেন যে প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি আরও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে ভেতরের ভূমিকার কারণেই। দেশের প্রাণ–প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে, যাকে আমরা বলতে পারি ‘উন্নয়ন স্বৈরতন্ত্র’, তার কারণে। যে–ই হোক, এসব বিষয়ে নীরব থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কথা বাগাড়ম্বর কিংবা প্রতারণা ছাড়া আর কী?

আমরা দেশে–বিদেশে পুঁজিপন্থী অনেক বিশেষজ্ঞ পাই, যাঁরা মনে করেন পরিবেশ বিষয়ে চিন্তা করা একটা বিলাসিতা। গরিব দেশ বা গরিব মানুষের এই বিলাসিতা সাজে না। আগে প্রবৃদ্ধি হোক, পরে পরিবেশ ঠিক করা যাবে। আসলে ঘটনাটা উল্টো। গরিবদের জন্যই নিজেদের সম্পদ, প্রাণ–প্রকৃতি রক্ষা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নদী, বন, আবাদি জমি, বাতাস নষ্ট হয়ে গেলে বিকল্প পাওয়ার উপায় তাদের আরও কম। পানি নষ্ট হলে ধনী কিনে খেতে পারে, বাতাস নষ্ট হলে ধনী এসি লাগিয়ে ঘুরতে পারে, পরিবেশ বিপর্যয় ঘটলে ধনী লোকজন অন্য দেশে পাড়ি জমাতে পারে। গরিবের জন্য তার উপায় নেই। তাকে দেশেই থাকতে হবে। তার জন্য উন্নয়ন মানে তার বর্তমানকে আরও সমৃদ্ধ করা, সব সম্ভাবনা নিঃশেষ করা নয়। প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে পুনরুৎপাদনের ক্ষমতা আছে কিন্তু তা মানুষের আগ্রাসী ভূমিকার কারণেই নষ্ট হয়ে যায়।

আর্থিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু নির্বিচার অন্ধ প্রবৃদ্ধি ও মুনাফামুখী পরিবেশবিধ্বংসী উন্নয়ন ও ভোগের ধাক্কায় পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। জিডিপি আর মুনাফা প্রবৃদ্ধিতে বিশ্ব দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। তাই বর্তমান উন্নয়নধারায় বৃদ্ধদের চেয়ে তরুণদের, তরুণদের চেয়ে শিশুদের, বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিপদ আরও বেশি। উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে মাতোয়ারা বাংলাদেশের জন্য এই কথা আরও বেশি সত্যি।

বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনের মূল কথা বিশ্বজুড়ে নিজেদের জীবন, সম্পদ ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর সর্বজনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। যুদ্ধ ও ধ্বংসে অর্থের অপচয়ের ধারা বন্ধ করে সর্বজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, গৃহায়ণে অর্থ জোগান। জ্বালানি, পানির ওপর সর্বজনের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। মূল করণীয় তাই উন্নয়ন–দর্শনের পরিবর্তন, যার সারকথা উন্নয়নকে নিছক প্রবৃদ্ধি, যেকোনো ধরনের নির্মাণ দিয়ে পরিমাপ করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসা; যেকোনো প্রকল্পের লাভ–ক্ষতি হিসাবে শুধু বিনিয়োগ-লাভ দিয়ে বিচার করার প্রচলিত চর্চা থেকে বের হয়ে এসে এর কারণে সমাজ-নদী-পরিবেশগত ক্ষতি তাতে যোগ করা; ব্যক্তির জন্য যতই লাভ হোক, তা যদি সামষ্টিক মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাকে উন্নয়ন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া; নদী, বন, আবাদি জমি নষ্ট হয়—এমন উন্নয়ন প্রকল্প বর্জন করা; সর্বজনের সম্পদ কোনোভাবেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে যেতে না দেওয়া; সব প্রকল্পের নির্বাচন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখা, জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্মতিকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নিশ্চিত করা। বিশ্বদরবারে এসব কথাই নানাভাবে আসছে কিন্তু কার্যকর পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো। বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি আরও সঙিন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ দূর করার দাবি নিয়ে কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গ বিশ্বের নেতাদের উদ্দেশে রাগী গলায় যা বলেছেন, তা বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশে এ দেশের যেকোনো শিশু–কিশোরের বক্তব্য হতে পারে, ‘… পরিবেশ ধ্বংসের মুখে। ব্যাপক বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে আমরা। আর আপনাদের আলাপের বিষয় টাকাপয়সা। আপনারা শোনাচ্ছেন অনন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গালভরা রূপকথা..কী ঔদ্ধত্য আপনাদের।…আপনারা যদি ঠিক করে থাকেন যে আমাদের বিপদে ফেলবেনই, তাহলে শুনে রাখুন, আমরা আপনাদের কখনোই ক্ষমা করব না।’

আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সর্বজনকথা পত্রিকার সম্পাদক anu@juniv.edu

LEAVE A REPLY