জলবায়ু সংকট থেকে পৃথিবী বাঁচবে কি করে?

0
34

মুর্শিদুল হক (বিদ্যুৎ):

২০১৬ সালে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন। জাতিসংঘের আয়োজিত এই সম্মেলনে ১৫০টি দেশের নেতা এবং ৪০ হাজার বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন-যার লক্ষ্য ছিল কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক চুক্তি করা। সবশেষ বড় মাপের যে জলবায়ু সম্মেলন হয়েছিল ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে, তার চাইতেও বড় আকারে হচ্ছে এই সম্মেলনটি। কোপেনহেগেনের সম্মেলনে কার্বন নির্গমন কমানোর একটি বৈশ্বিক চুক্তি হবার আশা থাকলেও শেষ অবধি তা হয় নি – কারণ সব দেশের মধ্যে তা নিয়ে ঐকমত্য হয় নি। তারপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে  – বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থেকেছে, সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। কি সেই সংকটগুলো?

পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে
গত ১০০ বছরে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৮৫ ডিগ্রি (০.৮৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বেড়েছে। এ যাবৎকালের ১৪টি উষ্ণতম বছরের মধ্যে ১৩টিই রেকর্ড করা হয়েছে একবিংশ শতাব্দীতে। এ ক্ষেত্রে ২০১৫ সাল উষ্ণতম বছরের আরেকটি নতুন রেকর্ড করতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশংকা করেন, যেভাবে এখন কার্বন নিগত হচ্ছে তাতে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২১০০ সালের মধ্যেই ২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে এবং তখন পৃথিবীর জলবায়ুতে গুরুতর বিপদজনক সব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করবে। এর মধ্যে খরা, বন্যা, ঝঙ, তাপপ্রবাহ ইত্যাদি প্রকৃতিক দুর্যোগ বেঙে যাওয়া, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেঙে যাওয়া, ফসল উৎপাদনের ধারায় পরিবর্তন, সুপেয় পানির সংকট ইত্যাদি অনেক ধরণের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।

গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন বাড়ছে
শিল্পকারখানা, কৃষি ও যানবাহনে তেল-কয়লা-প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদনের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন বাড়ছে। শিল্পবিপ্লবের পর এই গ্যাস নির্গমন বেড়েছে ৩০ শতাংশ। গত আট লক্ষ বছরের মধ্যে এখন পৃথিবীর বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ এখন সবচাইতে বেশি।

এর প্রতিক্রিয়ায় কি হচ্ছে?
পৃথিবীর মেরু অঞ্চলগুলোর জমাট বেঁধে থাকা বরফ গলে যাচ্ছে । ১৯৮০ সালের তুলনায় ইতিমধ্যেই যে বরফ গলে গেছে তার পরিমাণ যুক্তরাজ্যের আয়তনের দশগুণ। এর ফলে ১৯০০ সালের তুলনায় সমুদ্রের পানির উচ্চতা এর মধ্যেই গঙে ১৯ সেন্টিমিটার বেঙে গেছে। বেশ কিছু দ্বীপ ও নিম্ন উচ্চতার দেশ এখন ঝুঁকির মুখে আছে।

সবচেয়ে বেশি কার্বন নির্গত করছে কারা?
পৃথিবীর ৭০ ভাগ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গত করছে মাত্র ১০টি দেশ। এর মধ্যে ২৪ শতাংশ নির্গমন হচ্ছে চীন থেকে, ১২ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং ৯ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা করতে হবে যা প্রতিটি দেশ মানতে বাধ্য থাকবে। এমনি একটি পরিকল্পনা চুঙান্ত করার জন্যই প্যারিস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া আরো একটি বিষয় নিয়ে প্যারিসে সব দেশগুলোর ঐকমত্য হবার প্রয়োজন রয়েছে-তা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য দরিদ্রতর দেশগুলোকে সহায়তা করতে একটি ১০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল গঠন করা।

যে ৫টি উপায়ে আপনি বিশ্বের উষ্ণতা কমাতে পারেন-
মেরু অঞ্চলে বরফ গলে স্তর ক্রমেই পাতলা হয়ে আসছে। যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সতর্কবার্তা দেয়। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, “এখনই কিছু করুন নাহলে সংকটের ঝুঁকিতে থাকুন!” জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাপমাত্রায় বিপজ্জনক বৃদ্ধি এড়াতে বিশ্বকে “দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে”। জাতিসংঘের বৈশ্বিক উষ্ণতা বিষয়ক আন্ত সরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের গ্রহটি ১২ বছরের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির চূড়ান্ত সীমা ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। যেটা কিনা প্রাক-শিল্পযুগের মাত্রার থেকেও বেশি। এতে করে আবহাওয়া পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রূপ নেবে বিশেষ করে চরম দুর্ভিক্ষ, দাবানল, বন্যা সেইসঙ্গে লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। তাপমাত্রার এই সীমা অতিক্রম এড়াতে, বিশ্বের উচিত, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্রুত, সুদূরপ্রসারী ও নজিরবিহীন পরিবর্তন আনা। কিন্তু এক্ষেত্রে আপনি কি ধরণের সাহায্য করতে পারেন? সত্যি অর্থে প্রত্যেকের একক প্রচেষ্টা বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে বড় ধরণের ভূমিকা রাখতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বিষয়ক ওই প্রতিবেদনটির প্রধান সমন্বয়কারী লেখক অরোমার রেভির মতে, “সাধারণ কান্ডজ্ঞান কাজে লাগিয়ে মানুষ অনেক কিছু করতে পারে”। “বৈশ্বিক উষ্ণতা বেঙে যাওয়া ঠেকাতে বড় ধরণের পদক্ষেপ নিতে নাগরিক এবং ভোক্তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।” প্রতিদিনের জীবন থেকে এমন পাঁচটি ভূমিকার কথা তুলে ধরা হল, যেগুলো আপনি চাইলে আজ থেকেই পরিবর্তন করতে পারেন।

১. ব্যক্তিগত পরিবহন এড়িয়ে গণপরিবহন ব্যবহার করুন:
ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের পরিবর্তে হাঁটা, সাইক্লিং বা গণপরিবহনের ব্যবহার কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনার পাশাপাশি আপনাকে ফিট রাখতে সাহায্য করবে। আইপিসিসি এর উপ চেয়ারম্যান ড. ডেব্রা রবার্টস বলেছেন, “আমরা শহরে চলাচলের বিকল্প উপায় বেছে নিতে পারি। যদি গণপরিবহনে চলাচলের ক্ষেত্রে আমাদের প্রবেশাধিকার না থাকে। তবে নিশ্চিত করুন যে আপনি এমন রাজনীতিবিদদের নির্বাচন করছেন যারা গণপরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থাগুলো সরবরাহ করবে।” এছাড়া দূরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বাহন ব্যবহার করুন বা ট্রেন যাত্রাকে বেছে নিন। এছাড়া ব্যবসায়ী সফর বাতিল করে ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবহার করতে পারেন। শুধু প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহার করলেই চলবে না বরং শক্তি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে।

২. অযথা শক্তির অপচয় বন্ধ করুন:
ওয়াশিং মেশিনে যদি কাপড় ধুতেই হয় তাহলে সেটি শুকানোর কাজ মেশিনের টাম্বেল ড্রায়ারে না করে, বাইরের রোদে বা বাতাসের মধ্যে দডড়তে মেলে দিন। এতে কাপড় শুকানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। এছাড়া বিদ্যুতের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো এড়ানো যাবে। ঘরকে ঠান্ডা করতে এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা তার এর চাইতে বাড়িয়ে রাখুন। এবং ঘর গরম করতে হিটারের তাপমাত্রা কমিয়ে ব্যবহার করুন। পরের বার যখন আপনি কোন বৈদ্যুতিক সামগ্রী কিনবেন, তখন এটি নেবেন যে যন্ত্রটি শক্তি সঞ্চয়ে দক্ষ কিনা। এমন যন্ত্র কিনুন যেটা বিদ্যুত সাশ্রয় করে। নিজের প্রয়োজনীয় কিছু কাজের জন্য আপনি পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তির উৎস ব্যবহার করতে পারেন। যেমন: পানি গরম করতে সৌরশক্তিতে চালিতে সোলার ওয়াটার হিটার ব্যবহার করতে পারেন। শীতকালে বাড়ির স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ছাদে ঠান্ডা প্রতিরোধক স্তর স্থাপন করুন। গরমকালেও ছাদ ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা নিন। যেসব বৈদ্যুতিক সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে না সেগুলো আনপ্লাগ করে সুইচ বন্ধ করে রাখুন। এই বিষয়গুলোকে খুব ছোট পরিবর্তন মনে হলেও শক্তি সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি অত্যন্ত কার্যকরী উপায়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাক সবজি খাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হন।

৩. মাংস খাওয়া কমিয়ে নিরামিষ ভোজী হোন:
মুরগি মাংস, ফল, শাকসবজি বা শস্যের উৎপাদনের চেয়ে লাল মাংসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন ঘটায়। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১১৯টি দেশ কৃষিখাতে কার্বন নির্গমন কমাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল। তবে তারা কিভাবে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। কিন্তু তারপরও আপনি চাইলে এই কার্বন নির্গমন কমাতে সাহায্য করতে পারেন। আর সেটা সম্ভব হবে যদি আপনি তিনটি বিষয় মেনে চলেন। খাদ্যাভ্যাসে মাংসের পরিবর্তে সবজি এবং ফলের ওপর নির্ভরতা বাড়ান। যদি এটি খুব চ্যালেঞ্জিং মনে হয়, তাহলে সপ্তাহের অন্তত একদিন মাংস না খেয়ে কাটান। দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া কমিয়েও আপনি পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন। কেননা এসব খাদ্যের উৎপাদন ও পরিবহণে প্রচুর পরিমাণে গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়। আমদানি করা খাবারের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মৌসুমি খাদ্য বেছে নিন। এবং খাবারের অপচয় এড়িয়ে চলুন। পানির অপচয় রোধ করে এর পুন:ব্যবহারের চেষ্টা করুন।

৪. সবকিছু পুনর্ব্যবহারের চেষ্টা করুন-এমনকি পানিও:
আমাদের বারবার পুনর্ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে বলা হয়। কিন্তু কোন বস্তুকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে যে উপকরণ লাগে সেটার পরিবহন এবং প্রক্রিয়াকরণে প্রচুর পরিমাণে কার্বনের ব্যবহার হয়। তারপরও এটি নতুন পণ্য তৈরির চেয়ে কম শক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু পণ্যগুলো পুনঃব্যবহারের ফলে আরও নানা ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতে পারে। পানির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। অরোমার রেভির মতে, ” আমাদের পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের কাজে জডড়ত থাকার চেষ্টা করতে হবে।” ছোট বয়স থেকে সবাইকে পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা দিন।

৫. আপনার আশেপাশের সবাইকে এসব বিষয়ে জানান:
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সবদিকে ছড়িয়ে দিন এবং সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে শিক্ষিত করে তুলুন। একটি টেকসই কমিউনিটি জীবনযাত্রা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যদের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করুন। একটি অংশীদার-ভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন। যেন বিভিন্ন সম্পদ ভাগ করে ব্যবহার করা যায়। যেমন: ঘাস কাটার যন্ত্র বা বাগানের সরঞ্জামাদি। এতে একটি সবুজ জীবনযাত্রার মান অর্জন করা যাবে। অরোমার রেভি বলেছেন “এই সকল পরিবর্তনগুলো যখন কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন অনুশীলন করবে, তখন তারা তাদের কল্যাণে প্রায় কোন রকম প্রভাব ফেলা ছাড়াই টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।”

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটুকু?
বাংলাদেশের সাথে ভারতের অভিন্ন ৫৭টি নদীর পানি বন্টন সমস্যা অমীমাংসিত। দিন দিন নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে ফসলী জমির বিলুপ্তি ঘটছে। পানি শূন্যতার ফলে চরাঞ্চল বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলের দূষণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। দূষিত পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া নদী জলজ প্রাণি শূন্য হয়ে পড়ছে। বনাঞ্চল বিলুপ্তির ফলে বন্যপ্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। এতে করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে তাপমাত্রা। ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ৫৩ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবেন সরাসরি, জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পানি, মাটি ও ফসলের ওপর। উপকূলীয় মানুষ হারাবেন বাসস্থান, বাড়বে পানীয় জলের সংকট। তাই জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবিলায় ২০১০ সাল থেকে সাংগঠনিকভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ। এই খাতে ব্যয় করা হচ্ছে জিডিপির শতকরা একভাগ। কিন্তু এই অর্থ ব্যয় আর প্রকল্প নিয়ে এরই মধ্যে দুর্নীতি এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে।

১৯০০ সালে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ছিল ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়ে প্রায় ৩৪ ডিগ্রিতে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছর পর দক্ষিণাঞ্চলের ১৭টি জেলা সমুদে বিলীন হবার সম্ভবনা রয়েছে। পলিথিনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায়, পলিথিন ও প্লাস্টিকে দেশ সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মাটির উর্বরতাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস ও কীটনাশক যুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতিসাধন হচ্ছে। এছাড়া প্রযুক্তির বিকাশের সাথে প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির উচ্চমাত্রার কার্বন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই এ থেকে পরিত্রাণের জন্য চাই সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন।

জলবায়ু পরির্তনের হুমকির মুখে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৫৩ লাখ মানুষ
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে বর্তমান উপকূলীয় এলাকার ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হবেন। আর ২০৫০ সালে এই হতভাগ্য মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৩ লাখে। উপকূলীয় এলাকায় ৩ মিটার জলোচ্ছ্বাসে এখন ২০ লাখ মানুষ এর শিকার হন। এর চেয়ে বেশি জলোচ্ছ্বাস হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরো ৬০ ভাগ বেড়ে হবে ৩২ লাখ। জানা গেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, তীব্র জোয়ারের সময় বাতাসের গতি এবং জমির ক্ষয় বেড়ে যাবে আরো ১০ ভাগ। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টর্নেডোর ঘটনা ঘটে ১৯৮৯ সালে। সেবছরের ২৬ এপ্রিল মানিকগঞ্চ জেলার দৌলতপুর এবং সাটুরিয়া এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যায় প্রলয়ংকরী টর্নেডো। এতে প্রাণ হারায় ১,৩০০ মানুষ।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৫ লাখ গরিব মানুষ, যাঁদের মধ্যে ১৪ লাখ চরম দরিদ্র তাঁরা লবণাক্ত পানির কারণে পানীয় জল ও শুকনা মৌসুমে চাষাবাদের জন্য পনি সংকটে আছেন। তার সঙ্গে পানির চরিত্রও পরিবর্তন হয়ে গেছে, বদলে গেছে পরিবেশ ও প্রাণ বৈচিত্র্য। ২০৫০ সাল নাগাদ নাকি পানির এই লবণাক্ততা আরো বাড়বে। ৫২ লাখ গরিব মানুষ তখন এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হবেন, যাঁদের মধ্যে ৩২ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র অবস্থার মধ্যে থাকবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ ভাগ। আশঙ্কার বিষয় হলো, এর মধ্যে চরম দরিদ্র দুই কোটি ৪৪ লাখ মানুষ তাঁদের মৌলিক প্রয়োজন খাদ্যের চাহিদা মিটাতে পারেন না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্য হার সবচেয়ে বেশি। ১৯টি উপকূলীয় জেলায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে এক কোটি ১৮ লাখ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার এই দুর্ভোগ আরো বাড়বে বলে মনে করে ‘ক্লাইমেট প্রজেকশন অফ দ্য ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা।

নেতিবাচক প্রভাব মেকাবিলায় যা করছে বাংলাদেশ
২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) কাজ শুরু করে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশ এখন বছরে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ঝুঁকি মোকাবিলায়, যা জিডিপির শতকরা ১ ভাগ। ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২,৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এই খাতে। তবে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে এই বরাদ্দ করা টাকা কমছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেট বক্তৃতা থেকে জানা যায় যে, আসছে অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকা কমেছে। এ পর্যন্ত যে ২,৯০০ কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে, তার মধ্যে শতকরা ৬৬ ভাগ অর্থ বিভিন্ন প্রকল্প এবং ৩৪ ভাগ অর্থ জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলার কাজে লাগানো হয়েছে। ২,০০০ কোটি টাকায় ২১৮টি সরকারি এবং ৬৩টি বেসরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সরকারি ৫৬টি প্রকল্প এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি প্রকল্পগুলো মনিটিরিং-এর দায়িত্বে আছে সরকারি প্রতিষ্ঠান পল্লি কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের সময় জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ৬,৭৬০টি ঘর, ৭৪০টি গভীর নলকূপ, ১৪২ কিমি. বাধ, ১২,৮৭২টি পরিবারের সৌর বিদ্যুৎ এবং মোট ১৪৩.৩৫ মিলিয়ন গাছ লাগানোর কথা। আশার চর, বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে ওঠা এই চরটির বেশিরভাগ এলাকা এখন প্লাবিত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এলাকাটিতে প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ এরইমধ্যে লবণ সহিষ্ণু ধান নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার কৃষককে এই ধানের বীজ দেয়া হয়েছে। দেয়া হয়েছে চাষের প্রশিক্ষণ। তাছাড়া মাটি লবণ সহিষ্ণু হওয়ায় সূর্যমুখীর ফুলের আবাদও বেড়েছে। প্রসঙ্গত, সূর্যমুখী ফুলের বিচি থেকে ভোজ্য তেল পাওয়া যায়।

আমরা আশা করি, এখনো বিশ্বনেতাদের সমন্বিত পদক্ষেপ পৃথিবীকে এ সংকট থেকে বাঁচাতে পারবে। পাশাপাশি জলুবায়ু সংকটের জন্য দায়ী না হয়েও বাংলাদেশসহ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ৩৩টি দেশ যেন ক্ষতিপূরণ পেতে পারে সে বিষয়ে দায়ী দেশগুলোকে সকলে মিলে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এ সংকট থেকে উত্তোরণে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার এটাই মোক্ষম সময়। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। ধন্যবাদ।

লেখক:
সমাজকর্মী ও শিক্ষার্থী
Email: murshidbiddut@gmail.com
FB: www.facebook.com/murshidbiddut

 

LEAVE A REPLY