জার্নালিজম ডাইস ইন ডার্কনেস- বৈশ্বিক সাংবাদিকতা পেশার অপরাধ কোথায়?

0
56

১৭৭৬ সালে জুলাই ৪ এ রচিত আমেরিকার মূল খসড়া সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে- ‘যখন ক্ষমতার অপব্যবহার ও অধিকার হরণের পালা দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে এবং এভাবে স্বৈরতন্ত্রের আসনও পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। তখন ঐ ধরণের সরকারকে উৎখাত করে জনগণের ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্যে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাদের অধিকার ও কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়’। উল্লেখিত আমেরিকার সাংবিধানিক অংশটুকু আজকের বিশ্বায়নে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য হওয়ার নামান্তর। কারণ বিরাজমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আটকে পড়েছে- পুঁজিবাদে। এমনকি সর্বশেষ আমেরিকান রিপাবলিকান অরাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী এলিট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পও এসব পুঁজিবাদে জড়িয়ে নাস্তানাবুদ হচ্ছে। আর এ ব্যবস্থায় জড়ানোতে ট্রাম্পের আমেরিকাও অনেকটা তাদের গতিশীল নেতৃত্ব, মেধা ও প্রভাবে নিষ্প্রহ হয়ে পড়েছে। কারণ আমেরিকানদেরও ছিল গৌরবময় অভিজাত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ঐসব অভিজান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই অভিজাত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিকাশ ও সমৃদ্ধি নিহিত ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পও ও তাঁর প্রশাসন প্রতিনিয়ত আমেরিকার গণমাধ্যমে পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অসহ্য ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। তা না হলে সিএনএন এর সাংবাদিক জিম অ্যাকোস্টা অভিবাসী ইস্যুতে প্রশ্ন করতে গেলে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাঁর প্রেস স্ট্যাটাস হরণের মনোনিবেশ করেন। অতঃপর জিম অ্যাকোস্টা তাঁর অবস্থান আদালতে নির্দোষ প্রমাণ করে প্রেস স্ট্যাটাস ফিরে পায়। যা বৈশ্বিক গণমাধ্যমে সচরাচর ঘটে না। এসব তো গেল আমেরিকার গণমাধ্যমের সর্বশেষ কিছু নমুনা মাত্র।
আপনি যদি এক সময়কার অভিজাত, শৃঙ্খলিত ও মানবিক মানুষের অঞ্চল ইউরোপের দিকে তাকান- দেখবেন সেখানেও গণমাধ্যম কত ভয়াবহ সমস্যায় সময় অতিবাহিত করছে। এমনকি সেখানকার সাংবাদিকদের জীবন ও জীবিকা ব্যাপকভাবে বিপর্যয়স্ত। অধিকন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলিতে সাংবাদিকতা আজ এক ধরণের অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। অথচ সে সব দেশ গুলিতেই বৈশ্বিক মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভাল ভাল নজির রয়েছে। এমনকি বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সকল জরিপ ও রিপোর্টেও ইউরোপের দেশগুলি এগিয়ে রয়েছে। সেখানে সাংবাদিক জনগোষ্ঠির চিরাচরিত প্রচার ও প্রকাশ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এমনকি ঐসব দেশে ক্ষমতাসীন সরকারগুলি গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ কালাকানুন প্রনয়ণপূর্বক এক ধরণের পরোক্ষ সেন্সরশীপ আরোপ করে রাখছে। ঐ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র-মাল্টায় যেখানে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে অভিবাসী লোকজন প্রবেশ করে অভিজাত ইউরোপের জীবন-যাপনের উদ্দেশ্যে। মোটা অংকের টাকা দিয়ে এক অবৈধ নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে এবং ঐসব দেশের কর্পোরেটের রথি-মহারথিগণ ব্যাপক রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে টাকার স্বর্গরাজ্যে বসবাস করেন। অভিজাত পানামা খালের দেশ- পানামা যে বিশ্বের অভিজাত কোম্পানীগুলি কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধ ব্যবসায়িক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সে সবের এক ব্যাপক ও বিস্তৃত দুর্নীতির খতিয়ান ‘দ্য ডাফনী প্রজেক্ট’- পানামা পেপার্স। সেই সব পানাপা পেপার্স যখন প্রকাশের কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন মাল্টার খ্যাতনামা সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডাফনী কারুয়াণা গ্যালিজিয়ার নেতৃত্বে আর্থিক অনিয়মের একদল অনুসন্ধানী সাংবাদিক ঠিক সে সময়েই দ্য ডাফনী প্রজেক্টের কাজ চলাকালীন অবস্থায় অক্টোবর ১৬ ২০১৭ বিকাল ৩ঘটিকায় এক কৃত্রিম গাড়ী বোমা বিষ্ফোরণের মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করা হয়। সেই ডাফনী কারুয়াণা গ্যালিজিয়া তাঁর মৃত্যুর পূর্বে শেষ বক্তব্যেও বলেছিলেন- ‘সর্বত্র অপরাধীরা বিরাজমান, পরিস্থিতি আরো বেপরোয়া’। আর এ বক্তব্যের ঘন্টা খানেক পরেই তার গাড়ীতে পোতা বোমা বিষ্ফোরণেই মৃত্যু হয়। বিগত জানুয়ারি ২৪ ২০১৯ তারিখে বৈশ্বিক খ্যাতনামা সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের এক অন্যন্য প্রকাশনা প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে দ্য ডাফনী কারুয়াণা গ্যালিজিয়ার স্মরণে তাঁর সন্তান সফটওয়ার প্রকৌশলী ও আইসিআইজের সাংবাদিক ম্যাথিউ কারুয়াণা গ্যালিজিয়া, ওয়াল্ড ইকনোমিক ফোরামের ফেলো-অ্যানড্রিউ কারুয়াণা গ্যালিজিয়া ও টরটয়েজ’র ফিনান্সিয়াল এডিটর ও এলএসসির ফেলো- পল কারুয়াণা গ্যালিজিয়া যৌথভাবে এক কলামে লেখেন- ‘কিভাবে বিশ্বায়ন আমার মাকে হত্যা করলো’। উল্লেখিত মতামত কলামে দ্য ডাফনী কারুয়াণা গ্যালিজিয়া হত্যাকান্ড সম্পর্কে মতামতে উল্লেখ করেন- বিশ্বায়ন দিয়েছে সম্পদের প্রাচুর্য, বিস্মৃত ও সম্প্রসারিত খেলাধুলার সুযোগ। আর সে সবের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র অনিয়ন্ত্রিত আইনগত অধিকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে লাথি মেরেছে- সে সবরই বহিপ্রকাশ। সেখানে আরো বলা হয়েছে- বৈশ্বিক অপরাধ ও দুর্নীতি শুধুমাত্র মাল্টা বা ইউরোপে বিস্তৃত নয়, বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে নিষিদ্ধ করেছে- বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণকারী ঐ সংগবদ্ধ চক্র কিংবা হোতাগণ। অধিকন্তু প্যারিস ভিত্তিক জানুয়ারি মাসে শুরু হওয়া দ্য ডাফনী প্রজেক্ট সম্পর্কে যতদুর জানা যায়- সে প্রজেক্টটি তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বেই বিশেষত ২০১৭ সালের ১৭ই এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়েছিল। অতপর ঐ সালের পরবর্তী মে মাসে এক ঘরোয়া আলোচনার মাধ্যমে প্রজেক্টের সম্প্রসারিত কর্মকান্ড চলছিল। আর সেই প্রজেক্টের সেদিনকার আলোচনায় বসেছিলেন সাংবাদিক জেনিফার রেনকিন, ড্যানিয়েল বোফোয়ে ও ডেন সাব্বাঘসহ বেশ কজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। এছাড়াও এ প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন দ্য রয়টার্সের গ্রে, দ্য গার্ডিয়ানের স্টেফান ও ফিল্ম ম্যাকার জুলম গিরাউডাট এবং প্রচার ও প্রকাশনায় জড়িত ছিলেন- জার্মান ভিত্তিক জনপ্রিয় পত্রিকা ডাই জিয়েট ও সুদাউসিউ জিটাং। সর্বশেষ ডাফনী কারুয়াণা গ্যালিজিয়ার মৃত্যুর ১ বছর পর অক্টোবর ১৬ ২০১৮ তে ব্রিটিশ দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় উপন্যাসিক ও পেন ইন্টারন্যাশনাল অন্যতম সদস্য মার্গারেট এ্যাটউড তার কলামে লেখেন- ১ বছর পরও ডাফনী কারুয়াণা গ্যালিজিয়ার হত্যাকান্ডের বিচার কোথায়? এছাড়াও পৃথিবীর ১৫টি দেশের ৪৫জন রিপোর্টার্স ডাফনী হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে কলম সোচ্চার রেখেছেন। যাই হোক দ্য ডাফনী প্রোজেক্ট আইনগতভাবে অবৈধ ও সমস্যা সঙ্কুল দলিল ও খতিয়ানের সমাহার তাও উল্লেখ করেছেন ভ্যারা জারুভা। এদিকে ডাফনী কারুয়াণা বিচার না হওয়ায় বিশ্বব্যাপী বৈশ্বিক সাংবাদিকতার এলিটগণ ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিবর্গ সংশ্লিষ্ট দেশ ও অঞ্চলের রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গের নিকট আবেদন জানিয়ে যাচ্ছেন। আর এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের কনস্যুলেট অফিসে জামাল খাশোগী হত্যাকান্ডের কয়েকমাস পর জাতিসঙ্গের অধীনে নিরপক্ষ তদন্তকারী এগনেস ক্যালামার্ড’র নেতৃত্বে এক উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত কমিটি তদন্তরত। আর সংশ্লিষ্ট তদন্ত সম্পর্কে মি. ক্যালামার্ড বলেন- মে মাসের শেষের দিকে আমি আমার তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে জেনেভার মানবাধিকার কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রকাশ করবে। আমার পাশের দেশ ভারতেও মুক্ত গণমাধ্যমের কার্যক্রম খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বিগত ২৭/১১/২০১৮ তে গ্রেফতারকৃত ভারতীয় সাংবাদিক কিশোর চন্দ্র সাংখেম মণিপুরে মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতের পুতুল…. ইত্যাকার মন্তব্যের দায়ে ভারতীয় জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে। অথচ সাংবাদিক ছাড়া অন্য পেশার লোকজন আরো বেশী ও তীব্র ভাষায় মন্তব্য করলেও তাদের জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয় নাই।
আজকের গণমাধ্যমে শুধু রাজনীতিবিদদের মিথ্যার অপলাপ শুনবেন। তাদের বিরুদ্ধে কলম চালাতে পারবেন না। কলম চালালেই টুনকো অজুহাতে তাদের স্বার্থ নিহিত অভিজাত কেন্দ্রিক গণমাধ্যমের আইনে নির্যাতন, নিপীড়ন, মামলা, হামলা জেল, জুলুম, গুম ও পরিশেষে হত্যাকান্ড ঘটিয়ে লাশ পর্যন্ত গলিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর, বছরের পর বছর ধরে তাদেরই নিযুক্ত ও আর্শিবাদপুষ্ট ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যায়। তদন্ত হবে সময়ক্ষেপণ করে, রিপোর্ট প্রকাশ করবে সময়ক্ষেপণ করে। অতঃপর প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে ন্যায় বিচার সুদূর করা হতো। এসবই হলো বৈশ্বিক সাংবাদিকতার কালো অধ্যায় ও গণমাধ্যম বিরোধী কর্মকান্ডের সমাচার। পরিশেষে দ্য ওয়াশিংটন পোষ্ট পত্রিকার স্লোগানের মতো বলতে হয়- অন্ধকারে সাংবাদিকতা মরছে (জার্নালিজম ডাইস ইন ডার্কনেস)।
লেখক দ্বয়ঃ
খন্দকার মাসুদ-উজ-জামান
চেয়ারম্যান
গ্লোবাল জার্নালিস্টস কাউন্সিল ইন বাংলাদেশ
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
মহাসচিব
গ্লোবাল জার্নালিস্টস কাউন্সিল ইন বাংলাদেশ

LEAVE A REPLY