টেকসই দারিদ্র্য নিরসন ও উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়

0
24

বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার ইতোমধ্যে ৮ শতাংশের অধিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দারিদ্র্যের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। সামাজিক সূচকগুলোতেও অগ্রগতি বিশ্বের অনেক দেশ থেকে ভালো। তবে এই এগিয়ে চলায় সমস্যা আগেও অতিক্রম করতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও মোকাবিলা করতে হবে।

বর্তমানে মোকাবিলা করতে হচ্ছে এমন একটি উদাহরণ তুলে ধরব। এ বছর ধানের উৎপাদন অধিক হওয়ায় ধানের দাম পড়ে গেছে। ফলে কৃষক, বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষক খুবই দুর্দশায় নিপতিত হয়েছেন। অতীতে সময় সময় ধান ও অন্যান্য কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রেও এরকম হয়েছে। কৃষিখাতে এই সমস্যা অনেক পুরনো। এরকমটি ঘটেছে দশকের পর দশক ধরে।

আমি এখানে এ বছর কি করতে হবে সে বিষয়ে কথা বলছি না। বরং এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ক্ষেত্রে কিছু প্রস্তাব রাখছি। বাংলাদেশের কৃষক যে বছর ধানের দাম ভালো পান তার পরের বছর বেশি উৎপাদন করার চেষ্টা করেন তা ১৯৬০-এর দশকের গবেষণায়ও দেখা গেছে, আর এখনতো তাদের সচেতনতা অনেক বেড়েছে। তার পুনরাবৃত্তি এবারো ঘটেছে। গত বছর ধান-চালের দাম ভালো ছিল, কাজেই কৃষক অধিক উৎপাদনে সচেষ্ট হয়েছেন। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারও অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। যথা— কৃষি ঋণ, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য উপকরণে ভর্তুকি। হয়তো সঙ্গত কারণেই এ যাবত্ উত্পাদন বৃদ্ধির দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। চাহিদার দিকে, বিশেষ করে সরবরাহ-চাহিদার সামঞ্জস্য রক্ষায় নজর দেওয়া হয়নি। আবার দেখা যায়, যখন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয় তখন লেখালেখি হয়, আলোচনা হয়, সেমিনার হয় এবং সরকার কিছু পদক্ষেপ নেয়। তারপরে বিষয়টি পেছনে চলে যায় এবং আবার সেরকম সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগ পর্যন্ত সবাই প্রায় চুপচাপ থাকে। কিন্তু সমস্যাটি যেহেতু অতীতেও ঘটেছে, বর্তমানেও ঘটছে এবং আগামীতে যে ঘটবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায় যদি না তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়। কৃষিপণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তা না হলে মাঝে মাঝে এরকম সমস্যার ফলে দারিদ্র্য বাড়বে ও গভীরতর হবে এবং টেকসই দারিদ্র্য নিরসন ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

কৃষকের এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এক. (ক) কৃষককে সংগঠিত করা বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষককে (কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন নয় বরং সামাজিক পুঁজি গঠনের আঙ্গিক থেকে) যাতে তারা একসঙ্গে নিজেদের সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন এবং নিজেরা সমাধানে অথবা প্রয়োজনে সরকারের কাছে দাবি উত্থাপনে সচেষ্ট হতে পারেন। (খ) ফসল তোলার পর উত্পাদন কিছুদিন যাতে ধরে রাখতে পারেন সেজন্য প্রয়োজন মাফিক গুদাম তৈরি করতে হবে। এটি সরকার করতে পারে বা বেসরকারি খাতকে এই কাজটি করার জন্য উত্সাহিত করতে পারে। তা না হলে চাইলেও তারা উত্পাদন সংরক্ষণ করতে পারবেন না। (গ) কৃষকরা কৃষি উপকরণ ক্রয় বা অন্যান্য কাজের জন্য যে ঋণ গ্রহণ করে থাকেন তা ফসল উঠার পর পরিশোধ করেন এবং কিছু সামাজিক দায়দায়িত্ব পালনেও তারা এই সময়টা বেছে নেন। কাজেই ফসল তোলার পর বিক্রি করতে না পারলে ঝামেলায় পড়েন। তাই এই সময়ের জন্য সুদমুক্ত বা খুবই সহজ শর্তে তাদেরকে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। (ঘ) কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ইতোমধ্যে ছোট ছোট গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রশিক্ষণ-প্রযুক্তি এবং উপযুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে এ খাতকে উত্সাহিত ও সহায়তা করলে অর্থনীতিতে মূল্য সংযোগ ঘটবে এবং তা কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সহায়ক হবে।

এই কাজগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই কার্যকরভাবে সম্পাদন করা সম্ভব।

দুই. কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ও প্রশিক্ষণ দ্রুত বাড়াতে হবে যাতে উত্পাদন খরচ কমে আসে। উত্পাদন খরচ কমে আসলে বিক্রয়মূল্য কিছু কম হলেও মুনাফা থাকবে। বিরাজমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে লাগসই প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বেকারত্ব সৃষ্টি হলে সেটা আগে ভাগে বিবেচনায় নিয়ে যারা বেকার হবে, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজন হবে। তাদের কর্মসংস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য উত্স হতে পারে একটি বর্ধিষ্ণু কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত।

তিন. একটি স্থায়ী মূল্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন রয়েছে। এর আওতায় শুধু ধান-চাল নয় অন্যান্য কৃষি পণ্য যেমন আলু, তরমুজ ইত্যাদিও থাকবে। সার্বক্ষণিকভাবে এই কমিশন আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করবে, দেশের বাজার পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রত্যেকটি পণ্যের সরবরাহ চাহিদা ও মূল্য যেমন আছে এবং যে রকম হতে পারে সরকারকে অবহিত করবে। তাদের মূল কাজ হবে কৃষি পণ্যসমূহের বাজার ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য যাতে সঠিকভাবে কাজ করে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহ চিহ্নিত করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা। নিয়মিতভাবে বছরে দুইবার আর প্রয়োজনে আরো প্রতিবেদন তৈরি করবে। এ ছাড়াও কমিশন বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করবে এবং সরকারের কাছে সুপারিশ দেবে।

দেশের অর্থনীতির চাকা এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে এটি একটি সময়ে সময়ে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা সমস্যা। এরকম অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমস্যা থাকতে পারে বা সৃষ্টি হতে পারে। অর্জিত অগ্রগতি সুসংহত করে টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা আছে বা সৃষ্টি হতে পারে সেগুলোর সমাধানে যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এরকম আরো সমস্যা যেমন ব্যাংকিং খাতে নানা জঞ্জাল রয়েছে যেগুলোর দ্রুত সমাধান দেশের এগিয়ে চলা সুসংহত ও ত্বরান্বিত করার জন্য জরুরি। এক ধরনের বিরাজমান আত্মতুষ্টি ও গাফেলতি রয়েছে, বিশেষ করে উন্নয়ন বাজেট ও প্রকল্প বাস্তবায়নে। এর আশু সমাধান জরুরি। বিদ্যমান ও সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে কার্যকরভাবে সচেষ্ট হতে হবে যাতে অর্জিত অগ্রগতির উপর ভর করে দেশ অব্যাহতভাবে দেশের সকল মানুষের জন্য টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ

LEAVE A REPLY