নারীদের শিক্ষা নিয়ে বিতকের্র অবসান চাই: আবু মহি মুসা

0
45

তারা নিউজ ডেস্ক:
নারীদের শিক্ষা নিয়ে একটি বিতর্ক চলে আসছে অনেক দিন থেকে। এ বিতর্কের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন হেফাজতে ইলসলামের আমীর আল্লামা শফি। তিনি বলেছেন, ‘নারীদের বেশি পড়া শোনার প্রয়োজন নেই।’ এ নিয়ে অনেকে বিরূপ মন্তব্য করেছেন তার বিরুদ্ধে।
একবার নারীদের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য তাকে ‘ তেতুল হুজুর’ খেতাব দেয়া হয়েছিল। আমরা এই বিতর্কের একটা সন্তোষজক সমাধান চাই। এর সমাধান দিতে হলে, একটা মানদন্ডের প্রয়োজন। সেই মানদন্ড হচ্ছে ব্যক্তি স্বার্থ, পারিবারিক স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ, ধর্ম এবং দর্শন। ‘নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকে প্রত্যেকটি মানদন্ডে যাচাই করে দেখতে পারি। কিন্তু এর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে দেবে? দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, ‘ পৃথিবীর ৯৯,৯৯ ভাগ মানুষের জ্ঞান হচ্ছে পশু, পাখির জ্ঞানের চেয়েও কম (জ্ঞানানুযায়ী মানুষের শ্রেণি-বিভাগ ঃ জ্ঞানের গতি ও প্রকৃতি, পৃষ্ঠা- ৮১)। এ জ্ঞান দিয়ে কি কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব?
এখানে কয়েকটি মানদন্ডের কথা বলা হয়েছে। প্রথমই যদি ব্যক্তি স্বার্থ এবং পারিবারিক স্বার্থের কথা চিন্তা করি তাহলে নারী শিক্ষার প্রয়োজন আছে । একটা পরিবারে বাবা, মা, ছেলে এবং মেয়ে. সবাই যদি চাকরী করেন, তাহলে পরিবারটা স্বাচ্ছন্দে চলতে পারে। মেয়ে যদি পড়াশোন না করে, তাহলে একটা শিক্ষিত ছেলের কাছে মেয়েটাকে বিয়ে দেয়া যাবে না। এখানে রাজনৈতিক স্বার্থ বলতে, কোনো রাজনীতিবিদ যদি বলেন মেয়েদের লেখা পড়া করার কোনো প্রয়োজন নেই। সেই রাজনীতিবিদকে মেয়েরা ভোট দেবে না। কাজেই বলতে হবে, মেয়েদের লেখা পড়ার প্রয়োজন আছে।
পরিবারে যিনি প্রধান তিনি চাইবেন তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং পুত্রবধু সবাই চাকরী করুক। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবার হচ্ছে গোটা দেশ। যে দেশে অনেক ছেলে কেকার । সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান চিন্তা করবেন, বিবাহের পরে কোনো মেয়েকে বেকার বলা যাবে না। কারণ, দাম্পত্য জীবনে একজন নারী সংসারের ৮০ ভাগ কাজ করে। বর্তমান সময়ে বাবারা চাইবেন তার মেয়েকে লেখা পড়া শিখিয়ে একটা শিক্ষিত ছেলের কাছে বিয়ে দিতে। অন্যদিকে লেখা পড়া শিখে মেয়েদের প্রত্যাশা থাকে একটি চাকরীর। লেখা পড়া শিখে তারা আর ঘরে বসে থাকতে চায় না।
রাষ্ট্রপ্রধান চাইবেন ছেলেদের বেকারত্ব দূর করতে। একটা ছেলে চাকরী পেলে সে একটি মেয়ের দায়িত্ব
নিতে পারবে। দায়িত্ব নিতে পারবে মা বাবা ভাই বোনের। একজন মেয়ে চাকরী পেলে সে কখনোই বেকার ছেলে বিয়ে করবে না। এবং স্বামীর সংসারের দায়ভার গ্রহন করবে না। একটা মেয়ে চাকরী পেলে তার বেতনের অর্ধেক যাবে প্রসাধনী এবং যাতায়াতে। তাতে বিষয়টি এমন হয়ে থাকে, এক পরিবারে ছেলে মেয়ে চাকরী করছে। অন্য পরিবারে ছেলে এবং মেয়ে বেকার থাকছে। বেকারত্বের কারণে ছেলে বিয়ে করতে পারছেন না। রাষ্ট্রপ্রধান কি চাইবেন তার দেশে কেউ বেকার থাক? একজন পরিবারের প্রধান এবং রাস্ট্রপ্রধানের মধ্যে এটাই চিন্তার ব্যবধান। একটি ক্ষুদ্র স্বার্থ, অন্যটি বৃহৎ স্বার্থ। চাকুরীজিবী কোনো লোক সন্ত্রাসী হতে পারে না। জাতির সাথে কোনটিকে প্রাধান্য দেব?

আজ সর্বত্র নারীদের ক্ষমতায়ন এবং নারীদের সমধিকারের শ্লোগান উঠছে। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ জীবন বলতে মিলিত দুটো নর-নারীকে বুঝায়। কাজেই এখানে সমধিকারের প্রশ্নই অবান্তর। যারা সমধিকারের কথা বলেন, তারা কি এর ব্যাখ্যা দিতে পারবেন? স্বামী রোদ বৃষ্টিতে ভিজে বর্যাকালে মাঠে কাজ করে, সমধিকার বলতে স্ত্রীকেও বর্যাকালে রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কাজ করতে হবে? কর্মক্ষেত্র বলতে শুধু আফিসের কথা বলা হয়নি। পারবে তারা মঠে ময়দানে রোদ বৃষ্টিতে ভিজে এভাবে কাজ করতে? পারবে গর্ভে সন্তান নিয়ে কাজ করতে? একজন নারীকে কেন্দ্র করেই কিন্তু একটি পরিবারের সৃষ্টি। তাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

নারীদের ক্ষমতায়নের প্রশ্নে একজন দার্শনিকের চিন্তা চেতনা কেমন হতে পারে? সবাই লক্ষ করে থাকবেন যে বর্তমান সময়ে সংসারগুলো কিভাবে ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমার ছোট বেলা কখনো শুনিনি যে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে স্বামীকে ডিভোর্স দেয়া হয়েছে। জানা গেছে ৭০ভাগ নারী বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেছে। এ সব নারীদের ব্যক্তিগত সম্পদ আছে এবং তারা শিক্ষিতা। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছ্বলতা নারীদের সহনশীলতা নষ্ট করে দেয়। যে কারণে গ্রামে এমন একটি প্রবাদ আছে, বিয়ে দাও ধনীর ঘরে, বিয়ে করাও গরীবের ঘরে। তাতে ব্যালেন্স থাকে। লেখা পড়া জানা এবং অর্থ সম্পদের মালীক এ নারীকে যদি তার স্বামী কোনো কারণে একটি থাপ্পর মারে তখনই স্বামীকে বলবে ‘গুড’ বাই। গ্রামের লেখা পড়া না জানা মেয়েটিকে কিন্তু ১০টা থাপ্পর মারলেও সাংসার ভেঙ্গে বাপের বাড়ী যাওয়ার চিন্তা করবে না।
পরিবার প্রধান মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করার আগেই চিন্তা করে থাকে, স্বামী ডিভোর্স করলে, সে যেন খেটে খুটে খেতে পারে? যে নারী লেখা পড়া শিখে নিজের সংসার টিকিয়ে রাখতে পারে না তাদের শিক্ষার কানাকড়িও মূল্য নেই। এটা দর্শনের একটি অপ্রিয় সত্য কথা।
এবারের প্রশ্ন আসবে, লেখা পড়া শিখে ছেলে এবং মেয়েরা কি জ্ঞান অর্জন করে? আমি যদি দর্শনের ফ্যাকাল্টি নিয়ে কথা বলি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ফার্ষ্ট কোডের বইটিতে আছে, বিশ্বসৃষ্টি, বির্তনবাদ, ঈশ্বরের সমস্যাবলি, ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে এবং বিপক্ষে আলোচনা ইত্যাদি। এ সব বিষয়ে যদি আমরা কিছু জানতে না পারি তাহলে আমাদের কতটুকু ক্ষতি হতে পারে? ক্ষতি বা উপকার যদি না হয় তাহলে এটা পড়ে আমরা কি জ্ঞান অর্জন করবো? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে মতাবদগুলো হচ্ছে ঐশ্বরিক মতবাদ, বিবর্তনবাদ, মাতৃতান্ত্রিক পিতৃতান্ত্রিক চুক্তিবাদ এবং শক্তিপ্রয়োগ। এর একটিও গ্রহণযোগ নয়। (রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঃ সৃষ্টি থেকে ধ্বংস, পৃষ্ঠা-৩২১)। একজন ছাত্র এম.পাস করলেই তাকে জ্ঞানী বলা যাবে না। জ্ঞানী তাকে বলে, সকল ভাবগত সমস্যার সমাধান যে জ্ঞান থেকে আসবে তার ধারক হচ্ছে জ্ঞানী। জ্ঞানী বলতে গ্রামের অশিক্ষিত কিন্তু গ্রামে বিচার সালিশ করে, তাকে বলা হয় জ্ঞানী। নারীদের ওই জ্ঞান অর্জন করতে হবে যে জ্ঞান তার সংসারকে টিকিয়ে রাখতে পথ দেখায়।
নারী পুরুষের পার্থক্যটা যদি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে নারী পুরুষের মধ্যে অনেক পার্থক্য। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে স্বাভাবিক পুরুষের দৈর্ঘ্য যে কোনো স্বাভাবিক নারীর দৈর্ঘ্য থেকে বারো সেন্টিমিটার বেশি। দৈহিক ওজন, শিরা উপশিরার গতি ও শক্তি, নারীর অন্তঃকরণ পুরুষের অন্তঃকরণ ইত্যাদি বিষয়ে অনেক পার্থক্য (নর-নারী, সৃষ্টি থেকে ধ্বংস, পৃষ্ঠা-২১৯)। এই পার্থক্যে মূল হচ্ছে সংসার জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা।
সমধিকারের শ্লোগানের সাথে নারীরা এমন শ্লোগান কেন তোলে না যে, এক বছর গর্ভে আমি সন্তান ধারণ
করবো, পরবর্তী বছর স্বামীকে গর্ভ ধারণ করার আইন পাস করতে হবে? নাকি বলা হবে, যুগ যুগ ধরে পুরুষ শাসিত সমাজে তাদের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ করে রেখেছিল এ কারণে নারীদের লিঙ্গের এমন পরিবর্তন হয়েছে? নারীরাও এক সময়ে পুরুষ ছিল।
নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে। যারা এমন কথা বলেন তারা কি জানেন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ‘জ্ঞান এবং মেধার পার্থক্য ( জ্ঞান এবং মেধার পার্থক্য ঃ জ্ঞানের গতি ও প্রকৃতি. পৃষ্ঠা- ১৪৮)। জ্ঞানী এবং মেধাবীদের মধ্যে পার্থক্য আছে? ঠিক তেমনি পার্থক্য রয়েছে নারী এবং পুরুষের মধ্যে। যেমন, একজন পুরুষ মেধাবী হতে পারে, একজন নারীও মেধাবী হতে পারে। একজন পুরুষ বুদ্ধিমান হতে পারে, একজন নারীও বুদ্ধিমতি হতে পারে। কিন্তু একজন পুরুষ জ্ঞানী হতে পারে, কিন্তু নারীরা কখনোই জ্ঞানী হতে পারে না। নারীদের মধ্যে নবী এবং দার্শনিক আসেনি। তবে এতটুকু জেনে নিন, নারীরা যদি দৈহিকভাবে পুরুষের সমান শক্তিশালী এবং জ্ঞানী হতো, তাহলে ধর্ষণের অভিযোগ আর পুরুষদের বিরুদ্ধে থাকতো না। অভিযোগ আসতো নারীদের বিরুদ্ধে। জ্ঞানী এবং মেধাবীর কথা বলা হয়েছে। মেধাবীদের ক্ষেত্র কোনটি, যে ক্ষেত্রের সাথে স্মৃতির বিষয়টি জড়িত। যেমন, ডাক্তারী. ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিষয়গুলো মেধাবীরা পড়ে। জ্ঞানীদের ক্ষেত্র যে ক্ষেত্রের সাথে চিন্তা এবং মননশীলতা বিষয়টি জড়িত। যেমন, পরিকল্পনা প্রণয়ন, গবেষণা,বিচার কার্য। বিচার কার্য. এটা জ্ঞানীদের ক্ষেত্র। বিচার কার্যে নারী তো দূরের কথা, মেধাবী পুরুষকেও নিয়োগ দেয়া যাবে না। অথচ নারীকে বানালেন ম্যাজিস্ট্রেট, ডিসি, সচিব, সহকারী জজ, জেলা জজ, বিচারপতি। এটা একটি আত্মঘাতি পরিকল্পনা। আর এ কাণে বলা হয়েছে যে, ৩৪ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে রায়ের অপেক্ষায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এ মামলাগুলো কিভাবে, কবে শেষ হবে? সংসারগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে, এ ভাঙ্গন কিভাবে রোধ করা যাবে?
পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের ১০ভাগ নারী যৌন হয়রানীর শিকার, এ হিসেবটা শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কত ভাগ নারী যৌন হয়রানীর শিকার? চাকুরীজিবী অনেক নারী প্রমোশন পাওয়ার জন্য বসদের বিছানায় গিয়ে থাকে। এ সব বিষয়েকে আমরা কোনো দৃষ্টিতে দেখবো? একটা সময় ছিল শিশু কন্যা জন্ম নিয়ে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। আমরা কিন্তু সেই দিকেই যাচ্ছি। সমধিকারের কথাই যদি বলবেন, তাহলে কেন বলেন না, নারীদের ছমাস মাতৃকালিন ছুটি দেয়া হয়। পুরুষদের পিতৃকালিন ছুটি দিতে হবে ? তবে শফি সাহেবকে বলবো, এরকম অপ্রিয় সত্য কথা বলার জন্য পৃথিবীর বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর ৯৯,৯৯ ভাগ মানুষের জ্ঞান যদি পশু পাখির জ্ঞানের চেয়ে কম হয়, সেক্ষেত্রে এমন কথ বলা উচিৎ হবে না। ইতিহাস যার নামে কলঙ্কিত হয়ে আছে, সেই হিটলার মেয়েদেরকে বলেছেন, ‘গো টু দ্যা কিচেন ।’ নারীদের জ্ঞান অর্জন করতে হবে, বিদ্যা আর্জন নয়। যে জ্ঞান সংসারকে টিকিয়ে রাখতে পারে। আমরা এবার চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো। আমার মেয়ে নেই। মেয়ে থাকলে আমিও আমার মেয়েকে স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতাম। কারণ, আমার মেয়েকে একটি শিক্ষিত ছেলের কাছে বিয়ে দিতে হবে। শুধু এতটুকু বলবো, মেয়েদের লেখা পড়া করানো যাবে না, এ কথা বলা যেমন উচিৎ হবে না। তেমনি শফি সাহেব যে কথা বলেছেন, এ জন্য তার বিরুদ্ধে ‘তেতুর হুজুর’ নামক অশালীন কথও বলা যাবে না। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, এমন একটি সময় আসবে যখন একজন ন্যায়ের সমর্থক থাকলে ন’জন হবে অন্যায়ের সমথর্ক। সে সময়টা এখন চলছে। কাজেই নারীদের সমধিকার এবং ক্ষমতায়নের পক্ষেই সমর্থক থাকবে বেশী।
লেখক : দার্শনিক ।

LEAVE A REPLY