পাবনায় ১৪ জেলার ৫৯৫ চরমপন্থির আত্মসমর্পণ

0
47

তারা নিউজ ডেস্ক:

অন্ধকারে থাকা অস্বাভাবিক জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থিদের স্বাগত জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি। ভিন্নমতে বিশ্বাসী, ভিন্ন দর্শনে থাকা, ভিন্নভাবে জীবন পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েই স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিতের তাগিদেই মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর কাছে ১৪ জেলার সশস্ত্র ৫৯৫ জন চরমপন্থি নেতা ও সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। বিকাল তিনটায় পাবনার শহীদ আমিন উদ্দিন স্টেডিয়ামে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে পাবনা, টাঙ্গাইল, যশোর, নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী ও নওগাঁর ৬১৪ জন নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল লালপতাকা, জনযুদ্ধ, সর্বহারা, কাদামাটি পার্টি ও নকশালের আঞ্চলিক নেতা ও সদস্যরা আত্মসমর্পণের কথা থাকলেও অবশেষে ৫৯৫ জন আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণকালে চরমপন্থিরা বিভিন্ন ধরনের ৬৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫৭৫টি দেশীয় অস্ত্র জমা দেন।

আত্মসমর্পণকালে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বিগত ১৯৯৯ সালেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২ হাজার চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তিনি বলেন, আজ যারা আত্মসমর্পন করলেন, যারা এখন আত্মসমর্পণ করেননি, যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা আত্মসমর্পণ করলে তাদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থা আর আগের মতো নেই। তারা জলদসু্য, বনসদু্য, চরমপন্থি, মাদক সন্ত্রাসীদের দমন করতে সক্ষম। যেকোনো ধরনের নাশকতা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নির্মূলে পুলিশ বাহিনী সোচ্চার।

তিনি বলেন, পাবনার এই অনুষ্ঠানে যে সকল চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষিত। তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী কর্মসংস্থানের নির্দেশনা দিয়েছেন।

পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ২০ বছর পর আবারও চরমপন্থিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হচ্ছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি, সন্ত্রাস দমনের কারণে বর্তমানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো। তিনি বলেন, ২১ পুলিশ সদস্যের প্রাণের বিনিময়ে ২০১৩-২০১৪ সালে অগ্নিসন্ত্রাস রুখে দিয়েছিল দেশের চৌকশ পুলিশ বাহিনী। অনেক পুলিশ সদস্যের প্রাণের বিনিময়েই ২০১৬ সালে জঙ্গি রুখে দেয়া সম্ভব হয়েছে। উগ্রপন্থি নির্মূলে বাংলাদেশ পুরোপুরি স্বয়ংসম্পন্ন। তিনি আরও বলেন, চরমপন্থিরা জানেন, যে সন্ত্রাসী বাহিনীতে যোগ দিলে আর ফিরে আসা যায় না। যেখানে থাকলে পরিবার, সমাজ, আত্মীয়স্বজন কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না। সেখানে তারা কেন যান। পাঠোয়ারী বলেন, অনেক দেরিতে হলেও বিপথগামীরা সুপথে আসার সুযোগ পেয়েছে। আমরাও তা গ্রহণ করে তাদের আগামী জীবন সুন্দর ও আলোকিত করতে এগিয়ে এসেছি। তিনিও আহ্বান জানান, এখনো যারা অস্বাভাবিক অন্ধকার জীবনে রয়েছেন। তাদেরও সুযোগ রয়েছে আলোরপথে ফিরে আসার।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি, পাবনা-১ আসনের সাংসদ অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি, পাবনা-৩ আসনের সাংসদ মকবুল হোসেন, পররাষ্ট্র সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য, পাবনা-৫ আসনের সাংসদ গোলাম ফারুক খোন্দকার প্রিন্স, পাবনা-২ আসনের সাংসদ আহমেদ ফিরোজ কবির, রাজশাহীর বাঘার সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার এনামূল হক, পাবনা-সিরাজগঞ্জ সংরক্ষিত আসনের সাংসদ নাদিরা আক্তার জলি ও পাবনা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডিআইজি মাহবুব হোসেন, ডিআইজি এম খুরশিদ আলম, একেএম হাফিজ ওর্ যাবের কর্নেল জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।

আত্মসমর্পণকারী চরমপন্থি পরিবারের পক্ষে বক্তব্য দেন, পাবনার চরমপন্থি নেতা ইকবাল শেখের স্ত্রী রত্না খাতুন। তিনি বলেন, আমার স্বামী ভুল করে ভুল পথে গিয়ে বিপথগামী হয়ে পড়েছিল। তার কারণে সমাজে, পরিবারে, আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ দেখাতে পারিনি। বৃদ্ধ মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়িকে সেবাযত্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। আমার স্বামীসহ যারা আলোর পথে এলেন, তারা যেন এই সমাজে স্বাভাবিকভাবেই জীবনযাপন করতে পারেন।

আত্মসমর্পণের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ফরিদপুর-রাজবাড়ী অঞ্চলের লাল পতাকার নেতা আনোয়ার হোসেন, পাবনার সর্বহারা নেতা মোবারক হোসেন, ফরিদপুর-পাবনার সর্বহারা নেতা ইউসুফ ফকির ওরফে মিন্টু ফকির, সিরাজ সিকদার গ্রম্নপের মনসুর ওরফে স্বপন, সিরাজগঞ্জ-নাটোর-রাজশাহী-নওগাঁ-বগুড়া অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত লাল পতাকার নেতা আবু তালেব শেখ, সিরাজগঞ্জের লাল পতাকার নেতা আব্দুল আলীম, পাবনার লাল পতাকার নেতা বাবলু ব্যাপারী, বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ইকবাল শেখ, নাটোর-রাজশাহী-নওগাঁ-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের লাল পতাকার নেতা আব্দুর রাজ্জাক বাবু ওরফে আর্ট বাবু, সর্বহারা নেতা আতাউর রহমান ওরফে মোশারোফ, বগুড়া-নওগাঁ অঞ্চলের লাল পতাকার নেতা মহসিন আলম, নিউ বিপস্নবী কমিউনিস্ট পার্টি খুলনা-সাতক্ষীরা ও যশোর অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ফারুক মোলস্না, একই সংগঠনের আব্দুলস্নাহ আল মামুন, লিপু ব্যাপারী ও জয়পুরহাটের কাদামাটি সংগঠনের রমজান আলী সর্দারের হাতে আর্থিক প্রণোদনা তুলে দেন।

LEAVE A REPLY