বৈশাখ ২০১৯

0
58

তারা নিউজ ডেস্ক:

মধ্যবয়সী আকালু ছোটখাাটা চাকরি করেন। চাকরি ছোট হলেও কম্পানি বিশাল বড়। চিকন বুদ্ধিওয়ালা রোবট বানায়। এতে লাভ বেশি। এ কারণে পহেলা বৈশাখের বোনাসও দেয়। যদিও আকালু পহেলা বৈশাখের বিষয়টি ঠিক ধরতে পারেন না। বাংলা ক্যালেন্ডারে দুনিয়া তো দূরে থাক, তার নিজের দেশই চলে না, সেখানে এই ক্যালেন্ডারের এক তারিখে বোনাস পাওয়ার যুক্তি নাই। সেই হিসাবে পহেলা জানুয়ারিতে ডাবল বোনাস দেওয়া উচিত।

অবশ্য ১ জানুয়ারি ছুটি না থাকলেও ১ বৈশাখ আকালুর ছুটি। এটাই বড় কথা। কিন্তু এই ২০১৯ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে তিনি কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। এদিন সবাই করেটা কী? ইতিহাস কী বলে? এত পুরনো ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে এক মাস লেগে যাবে। আকালু শুধু জানেন, পহেলা বৈশাখের দিন সকালে একটা বড় ছাদে সবাই একত্র হয়ে বিশাল এক বাঁশি বাজায়। যার বাঁশিতে কান যত ঝালাপালা হবে সে হবে বিজয়ী। তাকে হাইড্রোকার্বনের একটি বিশেষ অর্গানিক স্যুপ খেতে দেওয়া হবে। সঙ্গে থাকবে কারখানায় তৈরি সিলিয়ান মাছের ফ্লেভার। নদী-নালায় সিলিয়ান মাছ আজকাল পাওয়া যায় না বললেই চলে। চাষের সিলিয়ান নিয়েও সেকি হৈচৈ। কলাম লেখকরা এ সময় কোমর বেঁধে নেমে বলেন, ‘এভাবে সিলিয়ান খেলে একদিন বাংলার ছাদের টাংকিগুলো সব সিলিয়ানশূন্য হয়ে যাবে। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে সিলিয়ান মাছের সম্পর্ক কোনো কালেই ছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি।’

আকালু নিজেও ঠিক জানেন না, বাঙালির পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আর কিসের সম্পর্ক আছে বা ছিল।

আজ আকালুর স্ত্রীরও অফিস ছুটি। সে আর দশ বছরের ছেলে নিমিন সাতসকালে তৈরি হচ্ছে পহেলা বৈশাখ পালন করবে বলে। শহরের উড়াল সেকশনের বিশ নম্বর ব্লকে থাকেন তাঁরা। নিচে নামতে গেলে হোভারক্রাফট ভাড়া করতে হয়। আকালুর চিন্তা হলো, খায়াদায়া কাম নাই, আবার বাড়তি খরচ।

‘আইজকা তো হোভারও পামু না।’

‘আজ কেউ গাড়িঘোড়ায় চড়বে না। আজ আমরা প্যারাশুট দিয়ে লাফ দেব। সোজা গিয়ে নামব ঢাকা আন্ত গ্যালাক্টিক বিদ্যালয়ে (ঢাআবি)। গ্যালাক্সির অন্যান্য প্রাণীরা আজ আমাদের হণ্টনে অংশ নেবে। তুমি প্যারাশুটের ইঞ্জিনটা চেক করে দাও।’

স্ত্রীর কথায় হাঁফ ছাড়লেন আকালু, ‘যাক, খরচ বাঁচল।’

নিমিনের দিকে তাকালেন। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। এই বয়সেই পেকে একাকার। আকালু ছোট থাকতে এত চঞ্চল ছিলেন না। বাবার কোল্ড ফিউশন মোটরসাইকেলটা চুরি করে একবার শুধু বাড়ি ছেড়ে হিমালয়ে গিয়েছিলেন পাহাড় আর বরফ দেখবেন বলে। গোটা দুনিয়ার আর কোথাও বরফটরফ নাই। সব গলে শেষ।

‘বাবা, আমি বৈশাখের ইতিহাস বের করেছি। চার-পাঁচ শ বছর আগে বাঙালিরা পান্তা নামে একটা জিনিস খেত। ভাতের সঙ্গে এইচ-টু-ওর রাসায়নিক বিক্রিয়া করে বানানো হতো ওটা। সঙ্গে নানা রকম মাছ থাকত। এর মধ্যে ইলিশ নামের একটা নবম মাত্রার মাছ ছিল বেশি জনপ্রিয়। ওগুলোর একটাও এখন নেই বাবা। আর ভালো কথা, এই মেলা জিনিসটা কী? তুমি কখনো মেলায় গিয়েছিলে? আমার ইচ্ছা হচ্ছে এ সব কিছুই আবার নতুন করে বানাই।’

‘তোর যা খুশি বানা, বাবা। মেলাটেলা কী জিনিস, তোর দাদাও জানে না। তুই জানবি কী করে?’

‘আমি আরো পেছনের ইতিহাস নিয়ে পড়ছি, বাবা। অনেক মজা হতো পহেলা বৈশাখে।’

কথা না বাড়িয়ে আকালু তাঁর পরিবারসমেত প্যারাশুট দিয়ে ঝাঁপ দিলেন শহরের গ্রাউন্ড সেকশনে। নিচে গাদা গাদা বাড়ি। একটা আরেকটার সঙ্গে একেবারে লাগোয়া। ছাদে রেলিংবিরোধী আইন পাস হওয়ায় ভালোই হয়েছে। ছাদের সঙ্গে ছাদ জুড়ে তৈরি হয়েছে বিশাল মাঠ। এমন একটা মাঠে আয়োজিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান। ঢাআবির ক্যাম্পাসের ছাদে লোকে গিজ গিজ করছে। ছাদের নিচে খানিকটা দূরে সংরক্ষিত গাছ সেকশন। সেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই। আকালুর ইচ্ছা হলো ওই ঘন গাছের রাজ্যে গিয়ে নামতে। অনুষ্ঠানে তাঁর মন নেই। গাছ তাঁকে ছোটবেলা থেকেই টানে।

নিমিন তার খুদে কলাইডরযন্ত্র টিপাটিপি করতে ব্যস্ত। ইলেকট্রন প্রোটন সাজিয়ে সারাক্ষণই এটা-ওটা বানায়। বাতাস থেকে বিভিন্ন অণু-পরমাণু মিক্স করে মজার মজার সব খাবারও বানাতে পারে ও। প্রিন্টার দিয়ে সেই খাবার বা বস্তু চলে আসে হাতে।

ছাদে নামতেই ‘গুগল!’ বলে চিত্কার করে উঠল নিমিনি। এত খুশি হওয়ার কারণ কী?

‘বাবা, আমি পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য আবিষ্কার করেছি! প্রায় ৬০০ বছর আগের ঐতিহ্য। আমাদের মহান গুগলের সর্বশেষ ডাটা বেইসে যেটা ছিল সেটা। আমি একটা স্টল দেব এখানে। মানুষকে ৬০০ বছর আগের পহেলা বৈশাখ খাওয়াব, মানে চেনাব।

নিমিন দ্রুত তার কোয়ান্টাম ফোনে আবেদন করে স্টল পেয়ে গেল। ছাদের এক কোণে রোবটের দল এক মিনিটেই সাজিয়ে দিল সব। নিমিন তাতে একটার পর একটা খাবার প্রিন্ট করছে। ডিসপ্লেতে ভেসে ওঠা লেখাটা দেখে উপস্থিত জনতার চোখ কুঁচকে গেল, ‘পান্তা! হোয়াট ইজ দিস? সঙ্গে আবার ইলিশ, পুঁটি, পাবদা ফ্লেভারের প্রিন্টেড মাছ।’

‘আসল বৈশাখী খাবার খেতে আসুন জনগণ। পান্তা ছাড়া বৈশাখ হয় না। আর এটা হলো আমার বানানো বিশুদ্ধ অর্গানিক পান্তা। আপনাদের দাদার দাদাও যেটা খায়নি।’

আকালু ছেলের কাণ্ড দেখে বিরক্ত হলেন না। উত্সব বলে কথা। মজা করুক।

এদিকে আকালু তাঁর স্ত্রী ও নিমিনকে ছাদে রেখে নিজে চট করে নেমে পড়লেন গাছের সংরক্ষিত জোনে। ছোটবেলা থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ওস্তাদ তিনি। অজানা-অচেনা সব বৃক্ষ। এগুলো তাঁকে বরাবরই টানে। তাই আইন ভেঙে ঢুকে পড়লেন জঙ্গলে। আগেকার মানুষজন এসব গাছের নামটাম জানত। তাঁরও হঠাত্ ইচ্ছা হলো গাছের নাম জানার। হাঁটতে হাঁটতে হঠাত্ বুঝতে পারলেন, পথ হারিয়েছেন। পকেটে কোনো যন্ত্রপাতিও নেই যে পথ চিনবেন। একটা বিশাল বড় গাছের নিচে এসে দাঁড়ালেন আকালু। গাছ থেকে অদ্ভুত কিসিমের লতা নেমে এসেছে।

আচমকা একটা গলা শুনে লাফিয়ে উঠলেন আকালু, ‘ভাই, দেখেন! প্রাণভরে দেখেন। এর নাম বটগাছ। জায়গার নাম রমনা। এটাই সেই রমনার বটমূল। একটু পর নিরাপত্তা কমিটি এসে ধরবে আমাদের। অবশ্য চিন্তা নাই। মাত্র দুই ইউনিট জরিমানা করবে। কিন্তু সবার কপালে তো আর এ জায়গা দেখার সৌভাগ্য হয় না।’

‘আপনে জানেন কেমনে?’

‘আমি ইতিহাসে অবডি (অনেক বড় ডিগ্রি) করেছি। খুব বেশি লোক এসব জানে না। ছয় শ বছর আগে এখানেই লোকে জড়ো হয়ে বৈশাখের দিন নাচ-গান করত। কী দারুণ ব্যাপার, তাই না! কোনো অনুভূতি পাচ্ছেন মশাই!’

আকালু লজ্জায় পড়ে গেলেন। তাঁর গাছগাছড়া ভালো লাগে ঠিকই। বিশেষ কোনো অনুভূতি টের পেলেন না। তবে একটা প্রশ্ন করার জন্য গলাটা উসখুস করছে। থাকতে না পেরে করেই ফেললেন, ‘ইয়ে জনাব, এই নাচ-গান বিষয়টা কী?’

LEAVE A REPLY