মানুষের জ্ঞান পশু পাখির জ্ঞানের চেয়ে কম এর ব্যাখ্যা: আবু মহি মুসা

0
36

মানুষের জ্ঞান যে পশু পাখির জ্ঞানের চেয়ে কম, এর ব্যাখ্যা চেয়ে একজন টেলিফোন করেছেন। শুধু টেলিফোনেই নয়, অনেকেই এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন। বুঝতে না পারলে ব্যাখ্যা চাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। বলা হয়ে থাকে, অপ্রিয় সত্য কথা বলা নিষেধ। দর্শনে অনেক অপ্রিয় সত্য কথা আছে যা না বললে দেশ এবং জাতির ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু বললে, ব্যক্তি এবং দল ক্ষব্ধ হতে পারে। যে কারণে পৃথিবীর বিখ্যাত মনীষী সক্রেটিসকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এরকমই একটি অপ্রিয় সত্য কথা হচ্ছে মানুষের জ্ঞান সম্পর্কে। মানুষের জ্ঞান কতটুকু?
জ্ঞানের চারটি স্তর বা ফ্রাগমেন্টের কখা আমরা অনেকেই জানি । যেমন, সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধি, অলৌকিক জ্ঞান এবং দার্শনিক জ্ঞান। এর উৎস, বৈশিষ্ট্য, ক্ষেত্র এবং ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত কোনো আলোচনা পাওয়া যায়নি। এর সাথে জ্ঞানের আরও দুটি স্তর বা ফ্রাগমেন্ট যুক্ত হয়েছে আমার বইর মধ্যে। এর একটি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ জ্ঞান, অন্যটি অতি সাধারণ জ্ঞান। এ দুটোর প্রবক্তা আমাকে বলতে হবে। অভ্যন্তরীণ জ্ঞান এবং অতি সাধারণ জ্ঞান, এ দুটো সহজাত অর্থাৎ আপনা আপনি আসে। সাধারণ জ্ঞান এবং বুদ্ধি, এ দুটো অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, অলৌকিক জ্ঞান এবং দর্শন বা দার্শনিক জ্ঞান, এ দুটো আধ্যাত্মিক জ্ঞান। তিনটি নেচার এর উপর ভিত্তি করে ছয়টি ফ্রাগমেন্ট। এই ছয়টি জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে সমস্ত প্রাণি জগতকে ছয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন, কারো মধ্যে একটি জ্ঞান, কারো মধ্যে দুটি জ্ঞান, কারো মধ্যে তিনটি জ্ঞান, এভাবে। একটি জ্ঞান কোন প্রাণির মধ্যে? স্যার জগদীশচন্দ্র বসু বলেছেন, গাছের প্রাণ আছে। আমি বলেছি যার প্রাণ আছে, তার জ্ঞান আছে। যার জ্ঞান আছে, তার প্রাণ আছে। সে হিসেবে গাছের জ্ঞান আছে। যেমন, একজন লোক কোর্মা পোলাও পছন্দ করেন। রান্না করে তার কাছে এসব নেওয়া হলো। সে অজ্ঞান। জ্ঞান ফিরে না আসা পর্যন্ত সে খাদ্য খাবে না। এ দিয়ে বুঝতে হবে গাছের জ্ঞান আছ্ ে দুটো জ্ঞান কেঁচোর মধ্যে। যেমন, খাদ্য এবং জৈবিক জ্ঞান। তিনটি জ্ঞান পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণির মধ্যে। যেমন, হাঁস, মুরগী, পশু, পাখি ইত্যাদি, এদের মধ্যে আছে খাদ্য, জৈবিক, আত্মরক্ষা, সন্তান লালন পালন এবং ভয় ভীতির জ্ঞান । চারটি জ্ঞান বুদ্ধিমান প্রাণির। যেমন, বানর, শিম্পাঞ্জি, গরিলা, হণুমান ইত্যাদি। পাঁচটি জ্ঞান জিনের মধ্যে, অশরীরি প্রাণি। ছয়টি জ্ঞান মানুষের মধ্যে।
এই ছয়টি জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে মানুষকে আবার ছয়ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি জ্ঞান কোন মানুষের মধ্যে? মানুষ যখন মাতৃগর্ভে স্পার্ম থেকে বড় হয়ে পরিপূর্ণ মানুষ আকৃতি ধারণ করে তখন তার মধ্যে অভ্যন্তরী জ্ঞানটি আসে, এরপর সে হাত পা নাড়চাড়া করতে পারে। গাছের ক্ষেত্রে ভূমিকা একটি- খাদ্যের। মানুষের মধ্যে এ জ্ঞানের ভূমিকার দুটি। খাদ্য এবং প্রাণের অস্তিত্বের প্রকাশ। এই একটি মাত্র জ্ঞান নিয়ে শিশুটি জন্মে। জন্মানোর পরে তার মুখে যদি তরল খাবার তুলে দিলে সে খেতে পারে। এটা কারো কাছে শিখতে হয় না। প্রাণের অস্তিত্বে প্রকাশ ঘটে কিভাবে? একজন মুষ্ঠিযোদ্ধা মাথা আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এ সময় সে হাত পা নাড়াচাড়া করতে পারবে না, খেতে পারবে না, কথা বলতে পারবে না। অথচ তার প্রাণ আছে, কিন্তু প্রাণের অস্তিত্বে প্রকাশ নেই। শিশুটি কিন্তু ভূমিষ্ট হয়েই হাত পা নাড়াচাড়া করছে, খাচ্ছে, কাঁদছে। শিশুর যে জ্ঞানটি আছে, মুষ্ঠিযোদ্ধার মধ্যে সে জ্ঞানটিও নেই। এখানে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ জ্ঞানটি লোভ পেলে তার সব জ্ঞানগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ জ্ঞান ফিরে এলে তার সব জ্ঞানগুলো ফিরে আসবে। তাৎক্ষণিকভাবে সে উঠে বসবে, খাবে,কথা বলবে। এ জন্য এ জ্ঞানটিকে বলা হয়েছে। ফাউন্ডেশন অফ অল ফ্রাগমেন্টস্ অফ নলেজ। সব জ্ঞানের মূল ভিত্তি হচ্ছে এ জ্ঞানটি। যেমন, দালানের একটি অংশ থাকে মাটির নিচে, দেখা যায় না, দালানের শোভা বর্দ্ধন করে না। যেটাকে বলা হয়ে ‘ফাইন্ডেশন’. এই ফাউন্ডেশন সরিয়ে ফেললে দালানটা যেমন ধসে পড়বে, তেমনি এ জ্ঞানটি লোপ পেলে সব জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যাহোক, দুটো জ্ঞান যার মধ্যে তাকে বলা হয় নিরেট মূর্খ। তিনটি জ্ঞান যার মধ্যে সে মূর্খ তবে তার মধ্যে কিছুটা বুদ্ধি আছে। চারটি জ্ঞান যার মধ্যে সে বুদ্ধিমান, পাঁচটি জ্ঞান যার মধ্যে তিনি অলি আল্লাহ বা সাধু সন্নাসী। ছয়টি জ্ঞান যাদের মধ্যে তাদের বলা হয় মহাজ্ঞানী। যেমন, ধর্মপ্রবর্তক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী। আমরা অলি আল্লাহ বা মহাজ্ঞানী নই। অমরা হচ্ছি বুদ্ধিমান। আমাদের জ্ঞান চারটি। পৃথিবীর ৯৯.৯৯ ভাগ মানুষ বুদ্ধিমান। বিকাল বেলা অফিস ছুটি পরে বাড়ী ফেরৎ যে মানুষগুলোকে দেখা যায়, তরা সবাই বুদ্ধিমান। অর্থাৎ আমাদের জ্ঞন হচ্ছে চারটি। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, আমাদের একটি জ্ঞান মাইনাস। সে জ্ঞানটি হচ্ছে বুদ্ধি। বলা হয়েছে বুদ্ধি হচ্ছে একটি লেস ইমপর্টেন্ট জ্ঞান। কেন লেস ইমপর্টেন্ট? বুদ্ধি কিভাবে আসে এ কথা কিন্তু দর্শনের কোনো বইতে পাওয়া যায়নি। বুদ্ধি হচ্ছে, স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের মধ্যে বুদ্ধির সৃষ্টি। যেমন, আমার বন্ধু আমাকে তার রুমের চাবি দিয়ে বললো তুমি রুমের তালা খুলে রেষ্ট কর আমি আসছি। তালা কিভাবে খুলতে হয় আমি যদি না জানি তবে কি ঘরে প্রবেশ করতে পারবো? অভিজ্ঞতা আছে। আমি ভিতরে গেলাম। কিন্তু আমাকে যদি কোনো বন্দীশালায় তালাচাবি মেরে বন্দী করে রাখা হয়, আমি বের হতে পারবো? এ জন্যই এটাকে বলা হয়েছে লেস ইম্পটেন্ট ফ্রাগমেন্ট। আমাদের জ্ঞান তিনটি। আমাদের জ্ঞান তিনটি, হাসঁ, মুরগী,ছাগল, ভেড়া, পশু, পাখি, ওদের জ্ঞান তিনটি। ওরা যতটুকু চিন্তা করতে পার, যেমন, খাদ্য,জৈবিক, আত্মারক্ষা, সন্তান লালন পালন, ভয় ভীতির জ্ঞান, এর চেয়ে বিন্দু পরিমান চিন্তা করার ক্ষমতা আমাদের নেই। পার্থক্য হচ্ছে আমাদের মধ্যে মহাজ্ঞানীরা আসছেন, তাদের জ্ঞান আমরা ধারণ করতে পারছি। তাঁরা যদি কোনো কালেই আমাদের মধ্যে না আসতেন, আমরা আজও বন্য প্রাণির মত উলঙ্গ হয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। তার প্রমাণ অফ্রিকার জঙ্গলের জনগোষ্ঠী। তারা সম্পূর্ণ উলঙ্গ। কারণ তাদের মধ্যে কোনো মহাজ্ঞানী মনীষী আসেননি। আমরা যে ওদের চেয়ে বেশি চিন্তা করতে পারি না, তার প্রমাণ এখানে। আমাদের গৃহিনীরা ভালো রান্না করতে পারেন। একটি শিশু কন্যাকে পঁচিশ বছর যদি কোনো বন্দীশালায় বন্দী করে রাখা হয়, এ সময়ে তাকে শাড়ী পরতে দেয়া হবে না, কথা বলা যাবে না। পঁচিশ বছর পরে তাকে বের করে আনা হলো। সে শাড়ী পরতে পারবে, কথা বলতে পারবে? রান্না করতে পারবে, আগুন ধরাতে পারবে? কি পারবে? কিছুই পারবে না পঁচিশ বছরের মেয়েটি। অথচ পঁচিশ সেকেন্ডে একটি সাপ ডিমের খোলস থেকে বের হয়ে দৌড়াতে পারে, খেতে পারে, ফণা তুলতে পারে। এবার প্রশ্ন, কে শ্রেষ্ঠ? ওরা না আমরা? অনেকে বলেন সে হিসেবে তো ওরা শ্রেষ্ঠ। আমাদের জ্ঞান কটি? তিনটি। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, না, আরও একট্ িমাইনাস। আমাদের জ্ঞান হচ্ছে দুটি। খাদ্যের জ্ঞান এবং জৈবিক জ্ঞান। এই দুটি জ্ঞানের মধ্যে মাত্র একটি জ্ঞান নিয়ে শিশুটি। এবং যার মধ্যে তিনটি জ্ঞান, মাতৃগর্ভ থেকেই সে তিনটি জ্ঞান জন্মে। যেমন, সাপ, কুচো, ব্যঙ। এবারও প্রশ্ন, কে শেষ্ঠ? ওরা না আমরা? এবারও একটি কথা বলেন, সে হিসেবে তো ওরাই শ্রেষ্ঠ। তাহলে কেন বলা হয় মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব? এ কথাটা কোরানের কোন জায়গায় আছে আশ্রাফুল মাকলুকাত কথাটি? কোনো জায়গায় নেই। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব এ কথাটার একটি ব্যাখ্যা আছে। ব্যাখ্যাটা এভাবে দেয়া হয়েছে। গত বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় ফ্রান্স কাপ জিতেছে। এ দলটি শ্রেষ্ট। এই দলটিতে ছয়জন শ্রেষ্ট খেলোয়াড় ছিল। এই ছয়জন খেলোয়াড়ের কারণে এ দলটি শ্রেষ্ঠ। এই ছয় খেলোয়াড়কে যদি মাঠের বাইরে রেখে এ দলটি খেতে পারতো তবে কি জিতে পারতো। শ্রেষ্ঠ দল হিসেবে বিবেচিত হতো? ঠিক, তেমনি মানুষের মধ্যে ছয় শ্রেণি মহামানবের কথা বলা হয়েছে। যেমন, ধর্মপ্রবর্তক (নবী), দার্শনিক, বিজ্ঞানী, লৌহমান, অলি আল্লাহ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানী, অক্ষরজ্ঞানহীন অথচ গ্রামে বিচার সালিশ করে থাকেন। তিনিও কিন্তু মনীষীদের কাতারে চলে আসছেন। ১৪টা ডক্টরেট ডিগ্রি নিলেও অন্যরা গ্রামে বিচার সালিশী করতে পারবেন না। এদেরকে বাদ দিলে. একটি গ্রাইন্ডসের উপর ভিত্তি করে বাকী ৯৯.৯৯ ভাগ মানুষ সম্পর্কে পবিত্র কোরানের সূরা তিন্ এর একটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সুম্মা রাদাদ না হু অস্ফাস্ সাফেলিন।’ সূরা আরাফের একটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বাল হুম আদাল’। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়টিকে সমর্থন দিয়ে বলা হয়েছে, সব চেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণির চেয়েও নিকৃষ্ট হচ্ছে মানুষ। যার প্রমাণ দিয়েছি বিশ্বজিতের ক্ষেত্রে, প্রমাণ দিয়ে হরতাল চলা কালে প্যাট্রোল বোমা মেরে নিরীহ যাত্রীদের হত্যা করে, প্রমাণ দিয়েছি রাখইনে জীবন্ত মানুষগুলোকে আগুনে পুড়ে হত্যা করে। এরপর কি আর বলা যাবে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষ এবং পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য করেছে মানবিক মূল্যবোধ। মানুষের জীবনে সব চেয়ে মূল্যবান বিষয় হচ্ছে এই মানুবিক মূল্যবোধ।মানুষর মধ্যে যখন ভিটামিনের অভাব হয়, তখন মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে। মানবিক মূল্যবোধের ভিটামিন হচ্ছে জ্ঞান। জ্ঞান যখন কমে যায় তখনই মানবিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তখন মানুষ পশুর মতো হয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে আর কারো কোনো সন্দেহ আছে বলে মনে করি না।
লেখ ঃ দার্শনিক ।

LEAVE A REPLY