রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট সমাধানে জাতিসংঘও কি অসহায়?

0
78

আজো আলোড়িত করে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুনের কিছু সুচিন্তিত দিক নির্দেশনা। তাঁর সময়কালে বিশেষত দ্বিতীয় মেয়াদে মহাসচিব থাকালে ২০১৪ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস ২০১৪ উপলক্ষ্যে এক বক্তব্যে বলেন- গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজগুলো কুসংস্কার ও হানাহানি থেকে মুক্ত নয়। স্বদেশ বঞ্চনার স্বীকার হয়ে যেসব লোক আশ্রয় ও দূর্যোগের সন্ধানে সীমান্ত অতিক্রম করছে তাদের প্রতি বৈষম্য ও বৈরতা বেড়ে চলছে। ঘৃণার মত অপরাধ ও অন্যান্য ধরণের অসহনশীলতা বহু সম্প্রদায়ের ক্ষতি করছে। উল্লেখিত বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া কিংবা আশ্রয় নেওয়া সংক্রান্ত বিরাজমান সংকট সমাধানে আমরা কিংকতর্ব্য বিমূঢ় হয়ে পড়ছি। আর এ ভাবনা ঐ সাবেক মহাসচিবের শান্তিকামি দিক নির্দেশনাগুলিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বার বার।

বার্তা সংস্থা আনাতোলিকে জাতিসংঘের তদন্ত টিমের কর্মকর্তা রাধিকা কুমার স্বামী জানান- রোহিঙ্গা শিশুদের আগুনে নিক্ষেপ পর্যন্ত করা হচ্ছে। যার ভয়াবহতা ও নৃশংসতার এক নজিরবিহীন অধ্যায়। একটি শিশু নিষ্পাপ ও পবিত্রতার প্রতীক তা পৃথিবীর সর্বজনবিদিত। মিয়ানমারে রাষ্ট্রহীন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ ও সর্বশেষ সংস্করণের মানবতা লংঘনের অপরাধের ক্ষেত্রে ঐ তদন্ত টিম সেখানকার ৬ জন জেনারেলকেও দায়ী করেছেন। এমনকি রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরগুলির শোচনীয় ও বিরাজমান চরম অবস্থা সম্পর্কেও ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক করেছেন। অধিকন্তু জাতি সংঘের তদন্ত প্রতিবেদন ২০১৮’র চেয়ে আরো ভয়াবহ অবস্থা বিরাজমান সেখানে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের বিশেষ দূত এনজেলিনা জোলিকে বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিবিরগুলি পরিদর্শনের জন্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়। একদিকে বাংলাদেশ সরকার প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ঐসব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নূন্যতম বেঁচে থাকার যোগান দিতে হলে সরকারের আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন। আর এ বাড়তি আর্থিক ব্যয়-ভার মেটানোর মত অবস্থা বাংলাদেশ সরকারের একেবারেই নেই। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের বলি আজ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা। আর এ সমস্যা এত প্রকট যে সেটাকে সামাল দেওয়ার জন্যে বাংলাদেশ সরকার ও সরকারের প্রতিনিধিগণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতজানু হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। এমনকি তাদের শেষ ভরসাস্থল জাতিসংঘের নিকট রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকটের সমাধান কল্পে ব্যাপকভাবে দ্বারস্থ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতি সংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখছে। আর এ গুরুত্বের অংশ হিসেবে জাতিসংঘের বিশেষ দূত এনজেলিনা জোলিকে ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে বিশেষত তিনদিনের সফরে রোহিঙ্গা শিবিরগুলি পরিদর্শন করে গেলেন। অধিকন্তু এ সফরের লক্ষ্যই ছিল ৯২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সাহায্য নির্ভর সফর। আর জাতি সংঘের ৯২০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য প্রাপ্তির যোগ্যতা যাচাইকরণ সংক্রান্ত সফর। বিশেষত ফেব্রুয়ারী ৪-৬ পর্যন্ত সফরের শেষদিনে জাতিসংঘের ঐ বিশেষ দূত সাংবাদিকদের সাথে সরাসরি কোন মত বিনিময় করেননি। এমনকি রোহিঙ্গা শিবিরগুলির ভয়াবহ দুরাবস্থা দেখে তিনি অনেকটা বিমর্ষ ছিলেন। বিগত ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে বিশেষত ২৫ আগস্ট ২০১৭ তে যখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল তখন ঐ শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে মানবাধিকার সংস্থাগুলি সরকারের প্রশংসায় বেশ সরব ছিল। কিন্তু যখন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে এসে তাদের বেচে থাকার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো বিষয়াদি পুরণে সক্ষম নয় তখন আর মানবাধিকার সংস্থাগুলি অনেকটা নীরব ও নিস্প্রহ হয়ে পড়ে।

জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর বিশেষ দূত এনজেলিনা জোলি প্রথম বারের মত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলি পরিদর্শনকালে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানান- সেখানকার রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা আব্দুল শুক্কুর নামের এক শরণার্থী আবেগতাড়িত কন্ঠে বলেন- বড় বড় লোক আসে যায়, কিন্তু আমাদের কি উপকার হয়? তারা রোহিঙ্গা স্বীকৃতি নিয়ে নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে ফিরতে চান। কিন্তু ঐ শরণার্থীর প্রত্যাশা কখন পূরণ হবে তার জবাবের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে…….। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে- বিশ্বের বৃহৎ এ শরণার্থীদের আবাসস্থলে শতকরা প্রায় ৮০% নারী ও শিশুর দৈনন্দিন জীবন যাপন অত্যন্ত নাজুক ও মানবেতর। অধিকন্তু ১৪৫টি বেসরকারি সংস্থা ও সংগঠনের ত্রাণ বিতরনের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর এর বিশেষ দূত এনজেলিনা জোলি যখন রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিবারের সাথে সাক্ষাত করছিলেন তখন তিনি জানতে পারেন- রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে গবাদি পশুর ন্যায় আচরণ করা হয়েছে। এজন্যেই তিনি সফরের শেষ দিকে বলেন- রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকটের টেকসই সমাধান ইউএনএইচসিআর কিভাবে সাহায্য করবে-সেটাই ভাবছেন। একদিকে এশিয়ান মোড়ল চীন ও তার সাথে রাশিয়ার আতাঁত যে রোহিঙ্গা সংকটকে প্রলম্বিত করছে তাতে সন্দেহ নেই। অন্য দিকে সংকটের সমাধান যাদের হাতে “মিয়ানমার সরকার” তারাতো জাতিসংঘকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে এমনকি কোন মানবাধিকার নীতিমালা ও সনদের তোয়াক্কা করছে না। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি অনেকটা হ্যাঁ হ্যাঁ বলে যাচ্ছেন। এক কথায় রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কিংবা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার কেন্দ্রীক মানবাধিকার বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়। অধিকন্তু দেশে চলছে নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক অনৈক্য ও সুশাসনের অভাব। তারই সাথে বাংলাদেশের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে নমনীয় হতে নারাজ অর্থাৎ তাদের আগেকার সিদ্ধান্তে অনড়। সেখানে কিভাবে আর্থিক সমন্বয়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট সমাধান সম্ভব?

লেখকদ্বয়:
খন্দকার মাসুদ-উজ-জামান
সম্পাদক ও প্রকাশক
তারা নিউজ বিডি.কম

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
তারা নিউজ বিডি.কম

LEAVE A REPLY