সড়কে প্রাণঘাতী নৈরাজ্য: বেপরোয়া চালকদের শাস্তি দিতে হবে

0
12

সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানোর দাবিতে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। গবেষক-বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করেছেন; কীভাবে সেসব কারণ দূর করা যায়, সে বিষয়ে তাঁদের সুপারিশ-পরামর্শও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের জানা আছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের চাপে সড়ক পরিবহন সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে শাস্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো সুফল মিলছে না। সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ও অঙ্গহানির খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

দুর্ঘটনা ও মানুষের অকালমৃত্যু সব সময়ই আকস্মিক ও অস্বাভাবিক বিয়োগান্ত ব্যাপার; কিন্তু এই অস্বাভাবিক ট্র্যাজেডি আমাদের জীবনে এমন প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে যে মনে হতে পারে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির এই উচ্চ হারই যেনবা আমাদের অনিবার্য নিয়তি। কোনো গুরুতর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কার্যকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগের অভাবে সেটির স্বাভাবিকীকরণ কিংবা গা সওয়া ব্যাপারে পরিণত হওয়া যারপরনাই হতাশাব্যঞ্জক।

এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির উচ্চ হারের প্রধান কারণগুলোর অন্যতম যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে নৈরাজ্য। আমরা যেসব গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনা লক্ষ করি, সেগুলোর অধিকাংশই ঘটে চালকের কারণে। গত বছর জুলাইয়ের শেষে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে একটি কলেজের সামনের ফুটপাতে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের ওপর একটি যাত্রীবাহী বাস তুলে দিয়েছিলেন বাসটির চালক। রাস্তা থেকে বাস ফুটপাতে উঠে পথচারীর মৃত্যু ঘটায়, এটাকে কী ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা বলা যায়? কেন এ রকম ঘটে? এমন নয় যে এ ধরনের অস্বাভাবিক সড়ক দুর্ঘটনা অত্যন্ত বিরল। বিরল তো নয়ই, বরং অহরহই ঘটে।

গত শুক্রবার রাতে গোপালগঞ্জের সোনাশুরে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পণ্যবাহী ট্রাককে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় একটি যাত্রীবাহী বাস। এতে ৪ যাত্রী নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছে একই কারণে; চালক বাসটি চালাচ্ছিলেন বেপরোয়া গতিতে। ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরার ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সংগীতশিল্পী পারভেজ রবকে চাপা দিয়ে চলে যায় যে বাসটি, সেটি চালাচ্ছিলেন কোনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লাইসেন্সধারী বাসচালক নন, বরং চালকের এক সহকারী। আর বাসটির চালকেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। পর্যটক বহনকারী একটি বাস ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি গিয়ে পৌঁছার পর চালকের সহকারী সেটা ঘুরিয়ে আনার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে চুরমার হয়ে যাওয়ার ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে।

যানবাহনের চালকদের বেপরোয়া যান চালানোর সমস্যাটি বহুল আলোচিত। আইন সংশোধন করে শাস্তির মাত্রা বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য তাঁদের এই বিপজ্জনক প্রবণতা রোধ করা। কিন্তু উদ্দেশ্যটি সফল হচ্ছে না প্রধানত এ কারণে যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য দায়ী চালকদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা না হলে কোনো আইনেরই সুফল মেলে না। সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের হতাশাব্যঞ্জক চিত্রের একটা বড় কারণ পরিবহন খাতের শ্রমিক ও মালিকদের অন্যায্য চাপ, যার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক আছে। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালানো, চালকের সহকারীদের চালকের ভূমিকা নেওয়া, বিপুলসংখ্যক চালকের ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স—এগুলোর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতি। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কদিন আগেই বিআরটিএর দুর্নীতি বিষয়ে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

প্রথমত, বিআরটিএকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন চালক ও চালকের সহযোগীদের যান চালানো বন্ধ করার লক্ষ্যে ব্যাপক অভিযান চালানো প্রয়োজন। আর সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও সংশ্লিষ্টদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।  তাহলেই হয়তো এই সমস্যার সমাধান খুজে পাওয়া যাবে।

সম্পাদক: খন্দকার মাসুদ-উজ-জামান

LEAVE A REPLY